স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঠেকাতে আচরণবিধি বদল বিদ্যমান আইনে নেই

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৮:৫৩ অপরাহ্ন, ১৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫৩ অপরাহ্ন, ১৮ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে নির্বাচনী আচরণবিধিতে নতুন অযোগ্যতার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার আইন ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ব্যাখ্যা বলছে, দলীয় প্রতীকমুক্ত নির্বাচনে কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে একজন নাগরিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অযোগ্য হন না। ফলে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সাংবিধানিক ও আইনি ব্যাখ্যার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা–কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু বর্তমান আইনি কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এমন কোনো বিধান বিদ্যমান নেই।

আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের ২৫ দিন আগেই চূড়ান্ত হবে কেন্দ্রের তালিকা

নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত চেয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খসড়া আচরণবিধি পাঠানোর পর জামায়াত তাদের লিখিত মতামতে প্রস্তাব দেয়, সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা–কর্মীকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো দলের নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। সে কারণেই নির্বাচন কমিশনের কাছে এ-সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন গড়তে প্রস্তুতি জোরদার, জাতীয় ভোটের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে ইসি

বিদ্যমান আইনে কী আছে: 

স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব, দেউলিয়াত্ব, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ড, ঋণখেলাপি, লাভজনক পদে থাকা, ঠিকাদারি স্বার্থ, দুর্নীতি, নির্বাচনী অপরাধ, পলাতক আসামি কিংবা যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত হওয়াসহ বিভিন্ন অযোগ্যতার বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এসব আইনে কোথাও কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকাকে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ কেবল কোনো দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেই সেই দলের সদস্য বা নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না—এমন বিধান বর্তমান আইনে নেই।

ইসির অবস্থান: 

সম্প্রতি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুই নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে না। ফলে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিষয়ে আলাদা কোনো নিষেধাজ্ঞা আইনেও নেই। আইনে যাঁরা প্রার্থী হওয়ার যোগ্য, তাঁরাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

অর্থাৎ কমিশনের বর্তমান ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হলে বিদ্যমান আইনে নির্ধারিত অযোগ্যতার শর্ত পূরণ হতে হবে। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি যথেষ্ট নয়।

কেন নতুন বিতর্ক: 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলাকালে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করায় তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হওয়ায় আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করার পর বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

সম্প্রতি সংসদেও এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

আচরণবিধিতে আরও যেসব পরিবর্তন চায় জামায়াত

আওয়ামী লীগের নেতাদের অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব ছাড়াও জামায়াত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা।

স্থানীয় সরকারে নিয়োজিত প্রশাসক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।

নির্বাচনী প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন।

প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রাখা।

নির্বাচনী ক্যাম্পে এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টর ও ল্যাপটপ ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান সংযোজন।

সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও সংবাদ সংগ্রহের অধিকার স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা।

ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী সদস্যপদের পরিবর্তে প্রতিটি ওয়ার্ডে সরাসরি নারী সদস্য নির্বাচন চালুর বিধান।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোটার নির্ধারণের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা।

এখন সিদ্ধান্ত ইসির: 

নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপে না গিয়ে লিখিত মতামত সংগ্রহ করছে। এসব মতামত পর্যালোচনা শেষে আচরণবিধির চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন করা হবে।

তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, আচরণবিধির মাধ্যমে নতুন করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তা বিদ্যমান আইন ও সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কারণ, প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মৌলিক বিষয় সাধারণত মূল আইনে নির্ধারিত হয়; কেবল আচরণবিধি দিয়ে সেই পরিধি সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। ফলে জামায়াতের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন হলে মূল আইনি কাঠামো সংশোধনের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি নির্বাচন আইন, সাংবিধানিক অধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার—এই তিনটি প্রশ্নের সমন্বয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।