হামের ১৫ লাখ ডোজ টিকা দেশে পৌঁছেছে , কিট সংকটে হাম পরীক্ষা কমেছে ৭৫ শতাংশ
হামে ৩২৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের ভিড়
দেশজুড়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪৫ হাজারের বেশি। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের তথ্য অনুযায়ী, হামের পাশাপাশি হামের উপসর্গ (জ্বর, কাশি, শরীরে র্যাশ/দাগ) নিয়ে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে গুরুতর নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এই রোগে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩২৪ জনে। তবে কিট স্বল্পতায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ বেশির ভাগ হাসপাতালে হাম পরীক্ষা কমেছে ৭৫ শতাংশ। তবে এ তথ্য মানতে নারাজ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, হাম ও রুবেলার ১৫ লাখ ডোজ এবং টিটেনাসের ৯০ হাজার ডোজ টিকা দেশে পৌঁছেছে।
সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৫ জন ও নিশ্চিত হামে ২ জন মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে মৃত্যু দাঁড়াল ৩২৪ জনে। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
আরও পড়ুন: দেশে বাড়ছে হামের সংক্রমণ, একদিনে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এমন শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৬৫৪ জন। হামে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে গত দেড় মাসে সারা দেশে ৩২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৫৬ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৬৮ জন। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে (পরীক্ষায় প্রমাণিত) ৬ হাজার ৯৯ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৪৪ হাজার ২৬০ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম ও হাম সন্দেহে ১৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ২৪ হাজার ৫৭ জন। এই হিসাব গত ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ৬ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের।
দেশে মিজেলস (হাম) ও রুবেলা পরীক্ষার একমাত্র কেন্দ্র জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ)-এর ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাব। সারা দেশ থেকে আসা হামের নমুনা এখানেই পরীক্ষা করা হয়। তবে বর্তমানে কিটের তীব্র স্বল্পতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি নমুনা গ্রহণ ও পরীক্ষার সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পরীক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাঁচ হাজারের বেশি নমুনা ল্যাবটিতে জমে আছে। কিট সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তাদের স্বাভাবিক পরীক্ষার হার প্রায় ৭৫ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।
আরও পড়ুন: ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৬ জনের মৃত্যু, মোট মৃত্যু ৩১৭
সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত ১১৪ প্যাকেট কিট ব্যবহার করে ১০ হাজার ৫৯৭ জনের হামের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে মাত্র ১৩টি কিট অবশিষ্ট আছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, প্রতিটি কিট দিয়ে ৯০ থেকে ৯৩টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। সেই হিসেবে অবশিষ্ট কিট দিয়ে সর্বোচ্চ ১২০০ নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন গুরুত্ব বিবেচনা করে মাত্র ১২০ থেকে ১৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। অথচ গত মাসেও এক দিনে সর্বোচ্চ ৭০০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।
গতকাল বুধবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর হাসপাতাল থেকে ১০টি নমুনা নিয়ে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসেন স্বাস্থ্য সহকারী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, তাকে প্রতি সপ্তাহে তিন দিন নমুনা নিয়ে আসতে হয়। বুধবার ১০টি নমুনা এনেছেন, যার রিপোর্ট আগামী সপ্তাহে পাওয়া যাবে। সব শিশুর নমুনা নেওয়া হয় কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু নমুনা নিয়ে আসা হয়, হাসপাতালে ভর্তি সবার নমুনা নেওয়া হয় না।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজি ল্যাব ইনচার্জ ডা. আমিরুল হুদা ভূঁইয়া জানান, এ মুহূর্তে কিটের স্বল্পতায় পরীক্ষা কম হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কিছু হাসপাতাল থেকে আসা নমুনাগুলোকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় (দিল্লি) থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৩০টি হাম শনাক্তকরণ কিট আগামী রোববারের মধ্যে বাংলাদেশে আসবে। এই ৩০টি কিট দিয়ে ২ হাজার ৭০০-এর মতো মিজেলস নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। এর কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও ১০০টি কিট প্রদান করবে। এই কিটগুলো পেলে আবারও সক্ষমতা অনুযায়ী পূর্ণদমে পরীক্ষা চালানো সম্ভব হবে।
একইসুরে কথা বলেছেন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান। তিনি বলেন, কিটের স্বল্পতা চলছে, তবে কিট একেবারে শূন্য হয়ে গেছে এমন নয়। আমরা সংকট মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। কিট পাওয়া মাত্রই আবারও প্রয়োজনে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হামের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের আইপিএইচের ল্যাবে সারা দেশ থেকে নমুনা নিয়ে আসা হয়, এর ফলে পরীক্ষায় কিছুটা সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। তবে হাম রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞরা রোগীর জ্বরের সঙ্গে কিছু লক্ষণ, যেমন— সারা শরীরে লাল র্যাশ দেখা দেওয়া, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া—এসব দেখেই নিশ্চিত হতে পারেন। তবে সবার পরীক্ষা করা গেলে আরও ভালো হতো।
দেশে পৌঁছেছে হামের ১৫ লাখ ডোজ টিকা:
হাম ও রুবেলার ১৫ লাখ ডোজ এবং টিটেনাসের ৯০ হাজার ডোজ টিকা দেশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ ইউনিসেফ থেকে কেনা টিকা গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ইউনিসেফ-কে প্রদান করেছে, যার মাধ্যমে ৯৫ মিলিয়ন ডোজ ১০ ধরনের ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইউনিসেফ গত ৩ মে প্রথম চালানে ১৫ লাখ ৫ হাজার ডোজ আইপিভি ভ্যাকসিন সরবরাহ করে। আজ অতিরিক্ত ১৫ লাখ ডোজ এমআর ও ৯০ হাজার ডোজ টিডি ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে। একইসঙ্গে আগামী ১০ মের মধ্যে আরও প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ ডোজ এমআর, টিডি, বিসিজি, টিসিভি, বিওপিভি ও পেন্টা ভ্যাকসিন দেশে পৌঁছাবে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব টিকা সরবরাহ সম্পন্ন হবে বলে জানান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ১৫ মাসের ভ্যাকসিন সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে তিন মাসের বাফার স্টক থাকবে। বর্তমানে দেশে টিসিভি ও এইচপিভি ভ্যাকসিনের দুই বছরের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। নতুন সরবরাহের ফলে আগামী ৮ থেকে ১২ মাস অন্যান্য ভ্যাকসিনেও কোনো ঘাটতি থাকবে না।
তিনি বলেন, ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৭৯ সাল থেকে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ১২টি প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইপিআই বর্তমানে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি সফল কর্মসূচি। গ্যাভি বাংলাদেশকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।





