শান্তি ফেরাতে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা
হামলা হলে সীমাহীন পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার কাতারের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকেরা তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। শনিবারও এ আলোচনা চলার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবরের মধ্যে নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে তেহরান।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলের রাস্তায় হাজারো মানুষ, ইহুদি-আরব সরকার গঠনের দাবি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় শনিবার জানায়, মোজতবা খামেনি সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নির্দেশনা দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের ওপর আবার হামলা হলে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখতে হবে। পাল্টা পদক্ষেপের ক্ষেত্রে কোনো ভৌগোলিক সীমা থাকবে না বলেও উল্লেখ করা হয়।
গত মার্চে নিজের বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন মোজতবা। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি কিংবা তাঁর বক্তব্যও শোনা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইরানের ইউরেনিয়াম তৃতীয় দেশে সরানোর প্রস্তাব, আলোচনায় হরমুজ প্রণালি
যুক্তরাষ্ট্রের চিঠি নিয়ে চলছে আলোচনা
এর কয়েক দিন আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তেহরানের উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠান। ধারণা করা হচ্ছে, চিঠিটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নেতা মোহসেন রেজাইকে উদ্দেশ করে লেখা হয়েছিল। দেশটির কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
চিঠির বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু শর্ত দিয়েছেন ভ্যান্স। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের দিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া এবং দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয় রয়েছে। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো হবে না বলে আগেই জানিয়েছে তেহরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন—এমন খবরও আগে নাকচ করেছিলেন। বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি দাবি করেন, ভ্যান্সের চিঠিতে ইরানে চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশের বিষয়টি ছিল।
ইরানের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি কয়েক দিনের মধ্যে আবার খুলে দেওয়ার বিনিময়ে গত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাবই মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে রয়েছে।
তেহরানের দাবির মধ্যে রয়েছে—ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবাননসহ আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতে যুদ্ধবিরতি। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।
ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এর কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা জানায়নি।
এদিকে ইরান-সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র *জমহুরি-ই ইসলামি* শনিবারের সম্পাদকীয়তে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আবার সংঘাত শুরু হতে পারে। তা সত্ত্বেও আগামী কয়েক দিনের আলোচনা ও বৈঠকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া জরুরি।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘যুদ্ধকে ইরানের জন্য অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি তৎপরতা
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জাহাজে হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং সমুদ্রপথে মাইন থাকার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল নিরাপদে সরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জাহাজ চলাচলে দিকনির্দেশনা ও নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে।
শনিবার বিকেলে ইরানের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে কেশম দ্বীপের কাছে দুটি মাছ ধরার নৌকায় মার্কিন ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে কয়েকজন জেলে আহত হয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করে, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালির ‘অননুমোদিত’ পথে চলাচলের সময় মাইনের আঘাতে অন্তত ছয়টি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব জাহাজের মধ্যে ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী একটি বিশাল ট্যাংকারও রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ সময় একটি বড় জাহাজে আগুন লাগার দৃশ্যও সম্প্রচার করে চ্যানেলটি।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) শুক্রবার নতুন ধরনের হামলার তথ্য জানায়। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, আগের দিন ওমানের খাসাবের উত্তর-পূর্বে একটি ট্যাংকারের কাছে ছোট নৌকা নিয়ে আসা হয়। নৌকাটি থেকে জাহাজের পানির ওপরের অংশে দুটি বিস্ফোরক ডিভাইস লাগানো হয়। পরে বিস্ফোরণে ইঞ্জিনকক্ষে আগুন ধরে যায় এবং জাহাজটির চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে।
ইউকেএমটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১৫৫টি জাহাজ প্রবেশ করেছে এবং ১২২টি জাহাজ বের হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই চলাচল ৭০ শতাংশ কম।
শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার জানান, তিনি হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় পণ্য, অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী কয়েক ডজন জাহাজ দেখেছেন। এসব জাহাজকে মার্কিন বিমান ও সামুদ্রিক ড্রোন নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছিল।
তিনি বলেন, সেখানে আইআরজিসির কোনো উপস্থিতি তিনি দেখতে পাননি। তাঁর দাবি, কয়েক দশক ধরে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় টহল দেওয়া ইরানের নৌবাহিনী এখন কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
যুদ্ধের হুঁশিয়ারি আরও কঠোর করছে তেহরান
দীর্ঘ আট মাসের সংঘাতের পর ইরানের নেতাদের বক্তব্যে আরও কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনার পর দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামনিয়া ট্রাম্প প্রশাসনকে নতুন করে হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি আবারও হুমকি ও ইসরায়েলের স্বার্থে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেন, তাহলে যুদ্ধের আগুন আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদেরও সমালোচনা করেছেন ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সম্প্রতি বলেছেন, গত আট মাসের যুদ্ধে ইউরোপের ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। এর জবাবে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজাই বলেন, যুদ্ধের সময় সমর্থন জানালেও এখন ইউরোপকে তার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধে সমর্থন জানানোর সময় কি ইউরোপ ভেবেছিল, এর প্রভাব তাদের ওপর পড়বে না? যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের মূল্য দিতে হয়, এখন সেই মূল্য দেওয়ার পালা তাদের।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও মের্ৎসের আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, গত বছরের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের হয়ে ‘কঠিন কাজটি করছে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর।
আরাগচি লিখেছেন, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী দেশটির জনগণের ক্ষতি করার সাহস দেখানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে আঘাত হানতে পারে, তার তুলনায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো কিছুই নয়। তাঁর ভাষায়, ‘পুরোনো সীমারেখার ধারণা এখন অতীত।’
নতুন হামলার পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ক্রিস মারফি জানিয়েছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে তিনি চলতি সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিকল্পনা ভয়াবহ উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং আইনের শাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের নিউক্লিয়ার ম্যাটেরিয়ালস সিকিউরিটি কর্মসূচির উপপ্রধান এরিক ব্রুয়ারও সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, ইরানের অবকাঠামোয় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে কী অর্জন করা সম্ভব, তা স্পষ্ট নয়। আগের হামলার পরও ইরান পুনর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে বলে ট্রাম্প নিজেই মন্তব্য করেছেন।
ব্রুয়ারের মতে, ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সামরিক হামলা চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত করলেও যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে তেহরান বাধ্য হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তিনি আরও সতর্ক করেন, ইরানের ওপর হামলা হলে দেশটি পুরো অঞ্চলে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের জন্য যুদ্ধ আরও ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, এমন অভিযানের ঝুঁকি সম্ভাব্য লাভের চেয়ে অনেক বেশি।





