অবৈধ বিজ্ঞাপনে জেল জরিমানার নোটিশ রাজউকের

৩৩ একরের অনুমোদন নিয়ে আশিয়ানের হাজারের বেশি আবাসনের প্রচারণা

Any Akter
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১:০৫ অপরাহ্ন, ২৩ অগাস্ট ২০২৫ | আপডেট: ৭:২৯ অপরাহ্ন, ২৩ অগাস্ট ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ঢাকার অন্যতম বড় আবাসন প্রকল্প আসিয়ান সিটির বিরুদ্ধে প্রতারণা করে প্লট বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকার থেকে মাত্র তেত্রিশ একরের আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে হাজার একরের বেশি প্রকল্পের এলাকায় জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচারণা দিয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। এক্ষেত্রে রাজউকের নির্দেশ অমান্য করে অনুমোদিত এলাকার বাইরে জমি  বিক্রয়ের চেষ্টা করছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে আশিয়ানকে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায় আশিয়ান সিটি প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে ২০০৫ সালে রাজউক এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৪৩ একর জমি উন্নয়নের অনুমোদন পায়। এটি নিয়ে এলাকাবাসীর সাথে দীর্ঘদিনের দখল বেদখল দ্বন্দ্বে অনেক মামলা হয়  আদালতে। দীর্ঘ মামলায় আদালতের রায়ের পর, রাজউক ৩৩ একরের বাইরে আশিয়ানের প্রচারণা ও বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেয়। আদালতের রায় ওর রাজউকের নির্দেশনার পরেও  আশিয়ান ফেসবুক বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, ব্যানার লাগিয়ে আসিয়ান সিটির  জমি বিক্রির নানা আকর্ষণে বিজ্ঞাপন চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে কিছু পক্ষ: সালাহউদ্দিন

এবার এক চিঠিতে আশিয়ানের অবৈধ বিজ্ঞাপনের জন্য ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, ৩ বছরের জেলের হুঁশিয়ারি রাজউকের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় আশিয়ান সিটি প্রকল্পের  মামলায় ২০১৪ সালে হাইকোর্ট এটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর দীর্ঘদিন এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকে। কোন প্রকার বিজ্ঞাপন বিক্রি বা আবাসন তৈরির কাজ করতে দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে হঠাৎ নড়েচড়ে ওঠে আসেন প্রকল্প। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ থাকলেও রং পাল্টে দ্রুত বিএনপি নেতা কর্মীদের কাছে যাতায়াত শুরু করে প্রচারণা চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্ন এলাকায় জায়গা জমি দখল সাইনবোর্ড ও মাটি ভরাটর শুরু করে। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ, স্মারকলিপি ও বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ, সেনা মোতায়েন

রাজউক সূত্র জানিয়েছে, মাত্র ৩৩ একর জমির অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও, আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড এক হাজার একরেরও বেশি জমিতে তাদের আশিয়ান সিটি প্রকল্পের প্রচারণা চালিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কে প্রকাশ্যে অমান্য করছে। সুপ্রিম কোর্ট কোম্পানিটিকে ৩৩ একর জমিতে প্রকল্পটি পরিচালনার অনুমতি দেয়। এই রায়ের পর, রাজউক অনুমোদিত এলাকার বাইরে পরিচালিত সমস্ত বিজ্ঞাপন, বিক্রয় এবং প্রচারণা অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। 

প্রকল্পের সীমানা যাচাই এবং যথাযথ অনুমোদন পেতে প্রয়োজনীয় সকল নথি জমা দেওয়ার জন্য কোম্পানিটিকে একটি আল্টিমেটামও দেওয়া হয়েছিল।

১৭ আগস্ট, রাজউকের ডেপুটি টাউন প্ল্যানার মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান  সাংবাদিকদের বলেন, “রায়ের ফলে আশিয়ান সিটি কেবল ৩৩ একরের মধ্যে কাজ করতে পারবে। তবে, আমাদের মাঠ পরিদর্শনে দেখা গেছে যে তারা ৬০-৭০ একর জমি দখল করে ব্যবহার করছে।” 

“তাদের ৩৩ একর সীমানা চিহ্নিত করতে এবং কঠোরভাবে এর মধ্যে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের নথিপত্র পর্যালোচনা করছি, তবে তারা সম্পূর্ণ ৩৩ একরের জন্য রাজউকের অনুমোদন পাবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।”

এর আগে ৪ আগস্ট রাজউক একটি নোটিশ জারি করে বলে যে ঢাকার দক্ষিণখানে ​​অবস্থিত আশিয়ান সিটি প্রকল্পটি রাজউকের অনুমোদন পায়নি। বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য মাধ্যমে এখনও বিক্রয় প্রচার করা হচ্ছে, যা অবৈধ। 

এর আগে মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত নোটিশে বেসরকারি আবাসিক ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা (২০০৪, সংশোধিত ২০১১ ও ২০১৫) এবং রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে অননুমোদিত বিক্রয় বা বিজ্ঞাপনের ফলে কমপক্ষে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা, তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

নোটিশে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, যদি অবৈধ কার্যকলাপ অব্যাহত থাকে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সময়মতো জমা না দেওয়া হয়, তাহলে রাজউক সকল বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া, জরিমানা আরোপ এবং অন্যান্য শাস্তি প্রয়োগ সহ আইনি ব্যবস্থা নেবে। 

প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এবং বেসরকারি আবাসিক ভূমি উন্নয়ন বিধি ২০০৪ (সংশোধিত) এর অধীনে সমস্ত শর্ত পূরণ করার পরেই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হবে। অনুমোদনের আগে কোনও বিক্রয়, প্রচারণা বা উন্নয়ন করা যাবে না।

মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজউক এখনও আশিয়ানের কাছ থেকে নোটিশের কোনও জবাব পায়নি। রাজউকের নির্দেশ সত্ত্বেও, প্রকল্পটি মূলত আদেশগুলি উপেক্ষা করেছে। ১৪ আগস্ট, আশিয়ান সিটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্লট বিক্রির জন্য একটি বিজ্ঞাপন পোস্ট করা হয়েছিল। প্রকল্প এলাকাটি এখনও বিলবোর্ড, ব্যানার এবং সাইনবোর্ড দ্বারা ঘেরা। 

আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ঢাকার উত্তরখান, দক্ষিণখান, বড়ুয়া এবং ডুমনি মৌজাকে কভার করে ২০০৬ সালে তার আশিয়ান সিটি প্রকল্পে প্লট বিক্রি শুরু করে। 

প্রকল্পটি প্রথমে ২০০৫ সালে রাজউক এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৪৩ একর জমি উন্নয়নের অনুমোদন পায়। পরে, আশিয়ান জমিটি ১,১৯৭ একরে সম্প্রসারিত করে - যা মূল আকারের প্রায় ৩০ গুণ বেশি - এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অনুমোদন পায়।

২২ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র সহ আটটি পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন আশিয়ান সিটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার জন্য হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। 

হাইকোর্ট একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। পরে একটি বৃহত্তর হাইকোর্ট বেঞ্চ মামলাটি পর্যালোচনা করে এবং ২০১৬ সালের আগস্টে, শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল করে।

আবেদনকারী সংস্থাগুলি আপিলের অনুমতি চাইলে, আপিল বিভাগ ৭ আগস্ট ২০১৭ তারিখে বৃহত্তর বেঞ্চের আদেশ স্থগিত করে। ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর, আপিল বিভাগ একটি পুনর্বিবেচনা আবেদন মঞ্জুর করে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে এবং প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বেঞ্চ এই রায় দেয়। 

পরবর্তীতে, ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে, সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্তটি বহাল রাখে, যার ফলে উত্তরা এবং ঢাকা বিমানবন্দরের কাছে ৩৩ একর জমিতে আশিয়ান সিটি প্রকল্পটি পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়।

সূত্র এবং গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে আইন এবং রাজউকের বিধিবিধান অমান্য করে তার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। 

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আন্দোলন চলাকালে সংগঠিত ঘটনায় খিলক্ষেত, উত্তরা এবং ভাটারা থানায় তার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১২টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জামিন জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে এবং বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন।