নতুন সরকারের উপযোগী করে সাজানো হচ্ছে প্রশাসন

পুলিশের স্বস্তি হলেও জনপ্রশাসনে উদ্বেগ হতাশা বাড়ছে

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২:০৬ অপরাহ্ন, ০৪ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ২:০৬ অপরাহ্ন, ০৪ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে চলছে নতুন সরকারের উপযোগী করে প্রশাসন সাজানো। গত ১৫ দিন ধরে চলছে সরকারের শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়োগ  প্রক্রিয়া। যেকোনো নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথমেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয় ও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে রদ বদল করে নতুন সরকারের উপযোগী করে সাজিয়ে নেয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসন ও পুলিশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলিতেই সরকারের প্রশাসন পলিসি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জনপ্রশাসনে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগের প্রাধান্য হওয়ায় দীর্ঘদিনের বৈষম্যের শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের মাঝে উদ্বেগ আতঙ্ক রয়েছে। অপরদিকে চুক্তি ও অবসরপ্রাপ্তদের কবল থেকে মুক্ত করে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে আইজিপি নিয়োগ করায় পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঝে স্বস্তি  বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অবসরভোগী বয়স্ক দুই কর্মকর্তাকে আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের শৃঙ্খলা নিয়ে পাশাপাশি জনমনে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। নতুন সরকার গঠনের পর অবসরপ্রাপ্ত আলোচিত বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পুলিশের শীর্ষ পদে নিয়োগের আলোচনায় থাকলেও বাহিনীর কর্মকর্তাদের মনোভাব বুঝে সরকার নিয়মিত ১৫ তম ব্যাচের আলী হোসেন ফকিরকে আইজিপি নিয়োগ করে। আইজিপির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বাহিনীতে নতুন কর্মচনচলের পরিবেশ তৈরি হয়। 

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা: ব্যক্তিগত যানবাহন কমিয়ে গণপরিবহণ ব্যবহারের আহ্বান

এদিকে জনপ্রশনে বছরের পর বছর রাজনৈতিক কারণে মঞ্চনা ভোলার শিকার নবম দশম ১১ তম, ১৩ ১৫  ১৭ ও ১৮ তম ব্যাচের কর্মকর্তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নতুন সরকারের বৈষম্যহীন নীতির আওতায় পদোন্নতি পদায়ণের। বাংলাদেশ সচিবালয়ের কর্মরত একাধিক অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ন সচিবের সাথে কথা বলে জানা যায় নতুন সরকার প্রশাসনে বদলি ও পদোন্নতির আবার উদ্যোগ নিলেও জুনিয়র কর্মকর্তারা বেশি উপকৃত হবেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত হয়ে চাকরির শেষ জীবনে এক দুই বছরের উপনীত হয়েছেন তাদের নিয়ে হতাশা র আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনে পদায়ন শুরু হয়েছে বয়স্কদের নিয়োগ দিয়ে।

প্রশাসনের শীর্ষ পদ কেবিনেট সচিব ও মুখ্য সচিব নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিরাশি ব্যাচের নাসিমুল গনি ও বৈষম্য বিরোধী কর্মচারী আন্দোলনের সভাপতি এ িব এম আব্দুস সাত্তার। ধর্ম সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন ৭০ বছর বয়সী অবসরভোগী কর্মকর্তা মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ। স্বরাষ্ট্র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা মনজুর মোরশেদ চৌধুরী। চুক্তিভিত্তিক শিক্ষা সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন 85 বেচের  কর্মকর্তা আব্দুল খালেক, স্বাস্থ্য সেব বিভাগে সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন লুৎফুজ্জামান বাবর এর সাবেক একান্ত  সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, কৃষি সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগ  পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদ এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন ১৭ বছর আগে অবসরে যাওয়া এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল হাসান। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সচিব ও গ্রেড ওয়ান বিভিন্ন দপ্তরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালুর সুপারিশ সাংবাদিক কর্মশালায়

নতুন সরকারের ১৫ দিনেও নিয়মিত কর্মরত কর্মকর্তা থেকে  একজনও এখনো সচিব নিয়োগ না করায় অধীর আগ্রহে প্রত্যাশী কর্মকর্তাদের মাঝে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। অথচ অন্তর্বর্তী শাসনামলের পুরো সময়েই এবিএম আব্দুস সাত্তার বৈষম্য বিরোধী কর্মচারী আন্দোলনের ব্যানারে  সচিবালয় সহ অন্যান্য দপ্তরে কর্মচারী সংগঠনের পক্ষে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। বৈষম্য বিরোধী কর্মচারী আন্দোলনের  নির্বাহী সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত সচিব  আব্দুল খালেক কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি মিটিংয়ে  আছেন বলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

এদিকে প্রশাসনে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

সোমবার (২ মার্চ) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে নতুন সরকারের প্রথম সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সরকারের এই সভায় বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে আলোচনা ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, এসএসবি সভা সাধারণত দেশের সরকারি প্রশাসনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের (যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব) পদোন্নতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের সুপারিশ করার জন্য অনুষ্ঠিত হয়।

সভা সূত্রে জানা গেছে, এবারের এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে রাজনৈতিক কারণে যারা বঞ্চিত এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি তাদের মধ্য থেকে মেধাবী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এতে প্রশাসনে নিয়মিত ১১ থেকে ১৮তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তার ভাগ্য খুলছে।

নতুন সচিব নিয়োগের জন্য প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষ এ কমিটিকে সরকারের আইন ও বিধি মেনে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে নিয়োগ পেতে জোর তৎপরতা ও প্রতিযোগিতা চলছে। বঞ্চিত কর্মকর্তারা সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তাদের দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করেছেন।

এক্ষেত্রে বিগত আওয়মাী লীগ সরকারের আমলে টানা ১৮ বছরে যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত তাদের নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পায় বিএনপি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল শুরু হয়।

আগের সরকারের সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া নয় সচিবের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। চারজন সচিবকে ওএসডি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রশাসনে ১৫ জন সচিবের পদ শূন্য।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়াও পরিকল্পনা কমিশনে সচিব পদমর্যাদার তিন সদস্যের পদ, ভৌত অবকাঠামো বিভাগ, আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ এবং শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য পদে কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে নেই। জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) সিনিয়র সচিব পদটিও শূন্য রয়েছে।

শূন্য পদগুলোতে বঞ্চিত এবং যোগ্যতা ও শর্ত থাকার পরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি এমন কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মেধাবী, দক্ষ ও অভিজ্ঞদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ সরকারের সাবেক সচিব ও বর্তমানে কর্মরত অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান নতুন সরকারের মন্ত্রী পরিষদের বেশিরভাগ সদস্যই ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। ১৮ থেকে ১৩ ব্যাচের অতিরিক্ত সচিব হয়ে সচিব হওয়ার জন্য অপেক্ষমান কর্মকর্তারাও একই বয়সের। ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ৬৫ থেকে ৭৫ বয়স পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সচিব পদে নিয়োগ পেলে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গতিশীলতার পরিবর্তে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে সরকারি কার্যক্রমের সাথে জড়িত নয়। প্রযুক্তি নির্ভর পরিবর্তনশীল বিশ্ব ব্যবস্থায় তাল মিলিয়ে দক্ষতার সাথে সরকারি সেবা প্রদান করা জটিলতায় পড়তে পারে। বঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশাসনের মূলধারার শীর্ষ পদে না এনে অন্য ভাবে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। বর্তমান সময়ে বিভাগীয় ও তত্ত্ব প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত অপেক্ষমান নিয়মিত কর্মকর্তাদের প্রশাসনের মূলধারায় পদায়ন করলে শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নতুন কেউ বৈষম্য থেকে নিষ্কৃতি পাওয়র সুযোগ  তৈরি হলো।