রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে চাই: সিইসি
অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শত শত প্রাণহানি ও সংঘাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে এবার ‘রক্তপাতহীন নির্বাচন’ আয়োজনকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আনফ্রেল বলেছে, ইসি আগের তুলনায় অধিক নিরপেক্ষতা দেখালেও নির্বাচনী অর্থের প্রভাব, পেশিশক্তি, জবাবদিহির ঘাটতি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকট এখনো বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হয়ে রয়েছে। ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে চাপ ও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছে কমিশন।
রাজধানীর একটি হোটেলে বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এবং আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল)-এর প্রতিনিধিরা এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: পল্লবীতে রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রী
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক সংঘাত, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে শান্তিপূর্ণ ও রক্তপাতহীন নির্বাচন আয়োজন করাই এখন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ভোটারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংঘাতের ভয়াবহতা তুলে ধরে সিইসি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত হন। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রাণ হারান ১১৬ জন। এসব তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি “বিরাট চ্যালেঞ্জ” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: রামিসার বাসায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
সিইসি জানান, দেশে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং প্রায় ৩৩০টি পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এত বিপুল সংখ্যক নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে কমিশন সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আনফ্রেলের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতায় কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এখনো গুরুতর কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনী অর্থের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব, অনানুষ্ঠানিক অর্থায়ন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আনফ্রেলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের প্রধান রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি, নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস, নির্বাচন বিশ্লেষক কার্লো আফ্রিকা এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর থারিন্দু আভেয়রাথনা। অনুষ্ঠানে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।
ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আনফ্রেলের নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস বলেন, তারা নির্দিষ্টভাবে ঋণখেলাপিদের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেননি। তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ মনে হয়েছে এবং আগের তুলনায় কমিশনের কার্যক্রমে উন্নতি দৃশ্যমান হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি এই বিতর্কিত বিষয়টি সমাধানে কমিশনের উদ্যোগের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।
তবে একই প্রশ্নে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় তিনি এ নিয়ে মন্তব্য করতে চান না। তবে কমিশন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি ‘দয়া’ দেখিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
আনফ্রেলের প্রতিবেদনে নির্বাচনী জবাবদিহিকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার “স্থায়ী সংকট” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো দুর্বল। বিশেষ করে অর্থের প্রভাব ও অস্বচ্ছ নির্বাচনী অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রচারণা ব্যয়ে প্রার্থীদের অতিরিক্ত অর্থ খরচের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং পোস্টার ও প্রচারসংক্রান্ত বিধিমালা প্রয়োগেও অসামঞ্জস্য ছিল। এতে কমিশনের নিজস্ব আইন ও বিধি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ভোটের দিন অর্থের প্রভাব নিয়ে আনফ্রেল বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি জানায়, বিভিন্ন কেন্দ্রে কিছু ভোটার রাজনৈতিক দলের দেওয়া ভোটার স্লিপ পোলিং এজেন্টদের সামনে প্রদর্শন করছিলেন, যা ভোট কেনাবেচা বা গোপন সমঝোতা যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া নির্বাচনপূর্ব সময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ, ভয়ভীতি ও পেশিশক্তির ব্যবহারও পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে।
যদিও ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খল ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে কিছু কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স খোলার সময় প্রয়োজনীয় যাচাইকরণ পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও জানানো হয়। যদিও এতে ফলাফল বদলে যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে আস্থাহীনতার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে আনফ্রেল।
প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গও উঠে আসে। এতে বলা হয়, এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। তবে একই সঙ্গে গণভোটের ফলাফল জুলাই সনদের অধীনে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রত্যাশা আরও জোরালো করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সিইসি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কমিশনের চলমান কর্মশালায় কোথায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে ভবিষ্যতে উন্নতি করা যায়—তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। কারণ একটি নির্বাচন কমিশন সাধারণত একটির বেশি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে না। তাই ভবিষ্যৎ কমিশনের জন্য অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগুলো সংরক্ষণ করতেই বর্তমান কমিশনের এই উদ্যোগ বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে আনফ্রেলের পর্যবেক্ষক দলের প্রধান রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দীর্ঘ সময় পর নির্বাচন কমিশন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে। কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় তাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতার বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা পাওয়া গেছে। তবে এই আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে নির্বাচনী অর্থ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত এবং জবাবদিহিভিত্তিক সংস্কার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।





