নিষ্ঠুর নির্যাতনের বিচার চেয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের আবেদন
৫ আগস্ট ছদ্মবেশে পালিয়ে যাওয়া ডিবির সাইফুল সাভারের ওসি হলো কিভাবে
পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় বিভিন্ন জেলায় চাকরি করে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত নেতাকর্মীদের নিষ্ঠুর নির্যাতন করে বিপুল অবৈধ উপার্জনকারী পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল ইসলামকে সাভার থানার ওসি নিয়োগ করায় তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে ধরতে পুলিশ অফিস ঘিরে ফেললেও মেহেরপুরের কুখ্যাত ডিবির ওসি সাইফুল তখন ছদ্মবেশে পালিয়ে যান। তার নিষ্ঠুর নির্যাতন ও অবৈধ অর্জনের কাহিনী মেহেরপুরের মানুষ আজও ভুলতে পারেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার ওপর চরম নির্যাতন, প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
মেহেরপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাচেষ্টা, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং শতকোটি টাকার অনলাইন জুয়া বাণিজ্যের মূল কারিগর হয়েও এই কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে সুশীল সমাজ, স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা।
আরও পড়ুন: সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক ডন গ্রেপ্তার
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দায়িত্ব পালন করেন সাইফুল আলম। ওই সময়ে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ অধিদপ্তরে দুটি লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে (স্মারক নং: ৪১৯, তারিখ: ৪ আগস্ট ২০২৬)।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর মেহেরপুর থেকে জনরোষের ভয়ে আত্মগোপনে চলে যান সাইফুল আলম। এর আগে ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময় তিনি শরীয়তপুর জেলা ডিবিতে থেকে গ্রেফতার বাণিজ্য এবং তার পূর্বে কিশোরগঞ্জ ডিবিতে কর্মরত থেকে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের গায়েবি মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে হয়রানি করা হতো। এছাড়া আওয়ামী শাসনামলে বাগেরহাটের মোল্লারহাটে শ্বশুরবাড়ির সুবাদে শেখ হেলালের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মেহেরপুর জেলা ডিবিতে তিনি নিজস্ব রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুটি লিখিত অভিযোগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ অধিদপ্তরে জমা হলে তদন্ত শুরু হয়েছে। যার স্মারক নং- ৪১৯।
সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ‘ক্যাশিয়ার’
মেহেরপুরের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও তাঁর পরিবারের গড়ে তোলা দুর্নীতি সাম্রাজ্যের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল আলম।
অনলাইন জুয়া বাণিজ্য: মন্ত্রীর স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকা মেহেরপুরের শতকোটি টাকার অনলাইন জুয়া ব্যবসার মূল তদারক ও অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন সাইফুল আলম। এই খাত থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা কালেকশন করা হতো।
তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি-নির্যাতনের পাশাপাশি ব্যাপক চাঁদাবাজিতেও সক্রিয় ছিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। সাবেক মেহেরপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ডিবি পুলিশ মেহেরপুর থেকে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। মন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনদের অবৈধ সিন্ডিকেটে কেউ বাধা দিলে ওসি সাইফুল আলমকে দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার ও হয়রানি করা হতো।
৫ আগস্টের পর সারা দেশে পুলিশ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বিতর্কিত পুলিশ সদস্যরা আত্মগোপনে গেলেও সাইফুল আলমের ক্ষেত্রে দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।
উল্টো মেহেরপুর থেকে সরিয়ে প্রথমে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় পদায়ন করা হয়। পরবর্তীতে গত ৩১ জুলাই ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা আক্তার স্বাক্ষরিত এক আদেশের মাধ্যমে তাঁকে সাভার মডেল থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ক্ষোভে ফুঁসছে মেহেরপুরের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন
জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা সাইফুল আলমকে সাভারের মতো স্পর্শকাতর থানায় পদায়ন করায় তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান এবং জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হুসাইন।
মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হুসাইন বলেন: ‘জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনকারী ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাইফুল আলমের স্থান হওয়ার কথা ছিল কারাগারে। অথচ তাঁকে শাস্তি না দিয়ে সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানায় পুনর্বাসিত করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সঙ্গে চরম প্রতারণা।’
জুলাই আন্দোলনের রক্তের দাগ না শুকাতেই ফরহাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত সাইফুল আলমের এই পদায়ন ঢাকা অঞ্চলেই জনমনে নানা প্রশ্ন ও গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা বাস্তবায়নে এমন বিতর্কিত ওসিকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে আইনের মুখোমুখি করার জোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় ছাত্র-জনতা।
২০০৭ সালে পুলিশের উপপরিদর্শক পদে যোগদান করা এই কর্মকর্তা দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের সময় খুবই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তাঁর চাকরির প্রতিটি স্টেশনেই নানা অভিযোগ ও নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে। পানিও নেতাকর্মী ও সচেতন মহলের কাছে প্রশ্ন উঠেছে, এতকিছুর পরেও এই কর্মকর্তা এখনো কীভাবে দাপটের সঙ্গে বহাল আছেন। এ বিষয়ে জানার জন্য ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা ইয়াসমিনকে বারবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।





