বিজয় শোভাযাত্রা আর নাচে-গানে দেবী দুর্গাকে বিদায়

Shahrier Islam Pallab
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ন, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫৪ অপরাহ্ন, ২১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায়’ বিজয় শোভাযাত্রা আর নাচে-গানে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাসের এক দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দেবী দুর্গার মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার এই ক্ষণে সবাই প্রার্থনা করেছেন, সকল প্রকার ভেদাভেদ, হিংসা ও অমঙ্গল দূর হয়ে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বিরাজ করে।

গতকাল বুধবার ভোর থেকেই বিজয়া দশমী উপলক্ষে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন প্রাঙ্গণে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। ছয় দিনের পূজা-অর্চনা, আনন্দ-উৎসব, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর পূজামণ্ডপগুলোতে দেবী দুর্গাকে শেষ বারের মতো বিদায় জানানো হয়।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে অপহৃত ব্যবসায়ী উদ্ধার, সাবেক সেনাসদস্যসহ আটক ৬

এদিন রাজধানীর বিভিন্ন মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের উপস্থিতি হতে দেখা গেছে। কোথাও চলে দশমী পূজা, কোথাও মায়ের বরণ, আবার কোথাও সিঁদুর খেলার আয়োজন। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে বিরাজ করেছিল বিদায়ের আবহ। এদিন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বিকাল ৩টায় বিজয়া শোভাযাত্রা বের করা হয়। পলাশী মোড় থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি পুরান ঢাকার সদরঘাটে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এরআগে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বুধবার সন্ধ্যার আগেই বিসর্জন সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।

‎সরজমিনে দেখা গেছে, তরুণ-তরুণী, স্বামী-স্ত্রীসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ পূজা দিতে এসেছেন। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে অনেকে পরিবার নিয়ে মন্দিরে এসেছেন। কেউ পূজা দিতে, কেউ দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করতে। পূজা-অর্চনা, মায়ের আশীর্বাদ কামনা ও সিঁদুর খেলার পাশাপাশি বিজয়া শোভাযাত্রাকে ঘিরেও ছিল বাড়তি আগ্রহ। টানা ছয় দিনের উৎসব শেষে দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ভক্তদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগও দেখা গেছে।‎

আরও পড়ুন: সৌদি আরবে বিমান চলাচলে বিধিনিষেধ, ক্ষতিগ্রস্ত ২০ হাজারের বেশি যাত্রী

‎মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে বিজয়া দশমী উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, এদিন সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর দশমী বিহিত পূজা ও পূজান্তে দর্পণ বিসর্জন সম্পন্ন করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। সকাল সাড়ে ১১টায় মায়ের বরণ, দুপুর ১২টায় স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং দুপুর সাড়ে ১২টায় সিঁদুর খেলার আয়োজন করা হয়। এদিন বিকাল ৩টায় পলাশী মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা শুরু হয়ে সদরঘাটে গিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই উৎসব। তবে ‎ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত ধর্মদাস চট্টোপাধ্যায় জানান, বিজয়া দশমীতে ‘বিহিত পূজা’ ও পরে ‘দর্পণ বিসর্জনের’ মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটেছে। এরআগে দশমী পূজায় প্রতিমার হাতে জরা, পান ও শাপলা ডালা দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়।

এদিন পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভক্তরা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। তবে ‎মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি অম্লান কুমার কার্তিক বলেন, ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পূজা ও বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। একপ্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেবী দুর্গার পূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এর মধ্য দিয়ে সমাজ, দেশ ও পৃথিবীকে দুর্নীতি, অশুভ শক্তি ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত রাখার প্রার্থনা করা হয়। অসুর নিধনের প্রতীকী তাৎপর্য অশুভ শক্তির বিনাশের শিক্ষা দেয়। সমাজে অন্যায় ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড দূর হোক, মানুষ শান্তিতে বসবাস করুক—এটাই পূজার অন্যতম কামনা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ ভালো থাকুক, দেশ ও জাতির কল্যাণ হোক—মায়ের কাছে সেই প্রার্থনা করেন তারা। একই কথা বলেছেন ‎ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আসা পুরান ঢাকার স্বর্ণা ঘোষ, পূর্ণিমা সাহা ও প্রতিমা সাহা। তারা বলেন, দুর্গাপূজা তাদের কাছে আনন্দ, ভক্তি ও সম্প্রীতির উৎসব।

দেবী দুর্গার কাছে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল এবং দেশ ও জাতির শান্তি কামনা করেছেন তারা। ‎ওয়ারী থেকে আসা শিপ্রা রানী রায় বলেন, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পূজা দিতে এসে ভালো লাগছে। সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় থাকুক, এটাই তার প্রার্থনা। ‎লালবাগের সঞ্জয় কুমার বলেন, দুর্গোৎসব ঘিরে সবার মধ্যে আনন্দ ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই সম্প্রীতি সারা বছর অটুট থাকুক, এটাই প্রত্যাশা। তাঁতীবাজারের শ্রাবণদ্রনাথ বলেন, দেবী দুর্গার কাছে পরিবার ও দেশের মানুষের মঙ্গল কামনা করেছেন। সবাই যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, এটাই তার চাওয়া। বনানী থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এসেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিয়া বিশ্বাস। তিনি বলেন, মা দুর্গা চলে যাচ্ছেন। মনটা খারাপ, আসছে বছর আবার হবে। মা দুর্গার কাছে অনেক কিছু চেয়েছি।

আশা করছি, সেগুলো পূরণ হবে। তিনি বলেন, মা দুর্গা আনন্দ নিয়ে আসেন, আবার চলে যান। আমরা পৃথিবীতে সুখ, শান্তি আর উন্নতি চাই। রাজধানীর ওয়ারীর টিপু সুলতান রোড থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আসা স্বপন বণিক বলেন, প্রতিবারের তুলনায় এইবার আমরা পূজাটা বেশি সময় পেয়েছি, খুবই মজা করেছি এই কয়েকদিন। তো আজকে প্রথমেই সকাল থেকে প্ল্যান ছিল যে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আসবো, সবাই মিলে মজা করবো, সিঁদুর খেলবো এটাই প্রত্যাশা। আর মা আসবে আবার প্রতি বছর, এটাই প্রত্যাশা করি। আসছে বছর আবার হবে।

এর আগে সারাদেশের মতো ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ ঢাকাজুড়ে নাচে-গানে মা দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা। বাজানো হয় দুর্গা পূজা নিয়ে গাওয়া নানা গান। এসময় ধর্মীয় নানা স্লোগান দেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সনাতন ধর্মালম্বীরা বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সারাদেশে দুর্গা উৎসব পালিত হয়েছে। মায়ের বিদায় বেলায় স্বভাবিকভাবে মা খারাপ। আশার বাণী হচ্ছে, এ বছর কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই উৎসব শেষ হচ্ছে। কারো মধ্যে আনন্দের কমতি ছিল না। রাত পর্যন্ত উৎসব পালন হয়েছে। সবাই মিলে সম্প্রীতির বাংলাদেশটাকে চাই এবং সবার মঙ্গল কামনা করি।