৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ভাষা আন্দোলনে গতি, কঠোর অবস্থানে ছাত্রসমাজ

Sadek Ali
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ১২:২০ অপরাহ্ন, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ২:১৪ অপরাহ্ন, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছিল প্রস্তুতি, সংগঠন এবং দৃঢ় অবস্থানের দিন। আগের দিন ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা অমান্যের স্পষ্ট ঘোষণার পর এই দিন আন্দোলন আরও সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত রূপ নিতে শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ঘিরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। একদিকে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশ, অন্যদিকে গোপন বৈঠক ও সংগঠনিক আলোচনা- সব মিলিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিকে সামনে রেখে প্রস্তুতি চলতে থাকে জোরেশোরে।

আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলনে স্পষ্ট অবস্থান, নিষেধাজ্ঞা মানা হবে না- ঘোষণা ছাত্রসমাজের

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট সভার আয়োজন করা হয়। ছাত্রনেতারা হলে হলে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, বোঝান আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ভাষার প্রশ্নে কোনো আপস নয়- এই বার্তাই সভাগুলোতে বারবার উচ্চারিত হয়। বক্তারা বলেন, এই আন্দোলন কেবল একটি ভাষার দাবি নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জানানো হয়, আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। তবে কোনো অন্যায় বাধা বা দমনমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে না। এই বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জোগায়।

আরও পড়ুন: হলভিত্তিক সভা ও লিফলেট বিতরণে জোর, ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরাও

৮ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যুক্ত হয়। সাংস্কৃতিক কর্মীরা আন্দোলনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে শুরু করেন। কবিতা পাঠ, দেশাত্মবোধক গান ও আলোচনা সভার মাধ্যমে ভাষার দাবি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা জোরদার হয়। এতে আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক বা ছাত্রপর্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ পেতে থাকে।

ঢাকা শহরের সার্বিক পরিবেশ ছিল থমথমে ও চাপা উত্তেজনায় ভরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নেতাকর্মীদের গতিবিধির ওপর রাখা হয় কড়া নজর।

তবে এই প্রশাসনিক চাপ ছাত্রসমাজকে দমাতে পারেনি। বরং সরকারি নজরদারি আন্দোলনকারীদের মধ্যে আরও দৃঢ়তা তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো ভীতি বা পিছু হটার লক্ষণ দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়টাতে ভাষা আন্দোলন আর শুধু ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ধীরে ধীরে একটি গণআন্দোলনের রূপ নিচ্ছিল। ছাত্রদের পাশাপাশি শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সচেতন নাগরিকদের সম্পৃক্ততা সেই রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

৮ ফেব্রুয়ারি সেই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই দিন স্পষ্ট হয়ে যায়- ২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে আন্দোলন আর থামবে না। ছাত্রসমাজ যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাই ৮ ফেব্রুয়ারি একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। প্রকাশ্য সংঘর্ষ না হলেও এই দিনের প্রস্তুতি, ঐক্য ও দৃঢ় অবস্থানই পরবর্তী দিনের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের ভিত গড়ে দেয়।