টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ফের বন্যার শঙ্কা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩৮ অপরাহ্ন, ০২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১২:০১ পূর্বাহ্ন, ০৩ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বর্ষার টানা বৃষ্টিপাত আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে, কোথাও কোথাও নদী উপচে নিম্নাঞ্চলে ঢুকতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রশাসনকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশজুড়ে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ও অরুণাচল প্রদেশে কয়েক দিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের নদ-নদীতে। এসব অঞ্চলের পাহাড়ি ঢল দ্রুত নেমে আসায় দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

আরও পড়ুন: দেশে ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরেও সতর্কতা

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাবে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারী বৃষ্টির প্রভাব আরও কয়েক দিন: 

আরও পড়ুন: ৮ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সংকেত

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়া রংপুর, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের অনেক এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হয়েছে।

একই সময়ে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ও অরুণাচল প্রদেশেও ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আগামী অন্তত পাঁচ দিন দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে নদ-নদীর পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায় বাড়ছে পানি: 

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার প্রায় সব নদীর পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী পাঁচ দিন পর্যন্ত এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

যদিও অধিকাংশ স্থানে নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচে রয়েছে, তবে কয়েকটি পয়েন্টে তা দ্রুত সতর্কসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল এবং নতুন জেগে ওঠা চরের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

সিলেট-সুনামগঞ্জে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা: 

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই দুই নদীর একাধিক পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

এর ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল, হাওর এলাকা এবং গ্রামীণ সড়কে পানি ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রংপুর অঞ্চলে বাড়ছে উদ্বেগ: 

রংপুর বিভাগের ধরলা, দুধকুমার ও তিস্তা নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানি নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব এলাকায় সাধারণত পাহাড়ি ঢল খুব দ্রুত নামে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ময়মনসিংহ অঞ্চলেও সতর্কতা: 

ময়মনসিংহ বিভাগের সোমেশ্বরী, ভুগাই, জিঞ্জিরাম ও কংস নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার কয়েকটি নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে।

এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের নদীগুলোও ফুলে-ফেঁপে উঠছে: 

চট্টগ্রাম বিভাগের সাঙ্গু নদীর পানি ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি গোমতী, মুহুরী, সেলোনিয়া, ফেনী, হালদা ও মাতামুহুরী নদীর পানিও আগামী কয়েক দিনে দ্রুত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পার্বত্য ও উপকূলসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

পদ্মা অববাহিকাতেও বাড়ছে পানি: 

পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীর পানিও ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও আগামী পাঁচ দিন এসব নদী বিপৎসীমার নিচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও অব্যাহত বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি ও জনজীবনে প্রভাবের শঙ্কা: 

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন নদীতীরবর্তী নিম্ন আয়ের মানুষ, চরাঞ্চলের বাসিন্দা এবং কৃষকরা। সদ্য রোপণ করা আমন ধানের চারা, সবজিখেত, মাছের ঘের ও গবাদিপশু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাভাবিক যোগাযোগও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিত প্রস্তুতি জরুরি। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং উদ্ধার সরঞ্জাম মজুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সতর্ক থাকার আহ্বান: 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ না থাকলেও নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষকে সর্বশেষ আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা, প্রয়োজন হলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা এবং গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত এবং উজানের ঢলের প্রবাহের ওপরই নির্ভর করবে দেশের বন্যা পরিস্থিতি কতটা বিস্তৃত হবে। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতে, আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি থাকলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।