নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসন
ভূমিদস্যুতা, মাদক ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ভোটাররা—শান্তি-নিরাপত্তা ফেরাতে কঠোর জনপ্রতিনিধিই চান রূপগঞ্জবাসী
ভূমিদস্যুতা, মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস—এই চারটি অপরাধ এখন নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ভোটাররা জানান, নতুন সরকার যেন দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ ও মাদকসহ সব ধরনের অপরাধ শতভাগ দমন করে—এটাই তাদের প্রধান প্রত্যাশা।
ভোটাররা বলেন, বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভূমিদস্যুতার কারণে মানুষ চাপ ও আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। বসতভিটা ও চলাচলের রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, পানি নিষ্কাশনে সমস্যা দেখা দিচ্ছে এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর স্বাভাবিক চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: নরসিংদীতে নির্বাচন উপলক্ষে যৌথবাহিনীর সভা
তাদের ভাষ্য, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী চক্র সক্রিয় থাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ অবস্থায় ভূমিদস্যুতা, মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে পারবেন—এমন জনপ্রতিনিধিকেই তারা সংসদে পাঠাতে চান।
আসনটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। এই আসনটি ৭টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো—রূপগঞ্জ, ভুলতা, মুড়াপাড়া, কায়েতপাড়া, দাউদপুর, ভোলাব ও গোলাকান্দাইল এবং পৌরসভা দুটি হলো কাঞ্চন ও তারাব।
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইল-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মিছিলে অসুস্থ হয়ে দুই সমর্থকের মৃত্যু
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, এই আসনে ১২৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮ হাজার ৮২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৮৫০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৯ হাজার ৭৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন।
বিপুলসংখ্যক পুরুষ ও নারী ভোটারের পাশাপাশি নতুন ভোটারদের মধ্যেও নিরাপত্তা ও মাদকমুক্ত পরিবেশের দাবি সবচেয়ে বেশি বলে জানান ভোটাররা।
একই সঙ্গে ভোটাররা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য রূপগঞ্জে এসে বসবাস করছেন। ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ে এই উপজেলার মধ্য দিয়ে গেছে। রয়েছে পূর্বাচল উপশহর ও জলসিঁড়িসহ একাধিক আবাসন প্রকল্প। জনবহুল এই উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরেই একজন দক্ষ ও সাহসী জনপ্রতিনিধির দাবি জোরালো।
সূত্রমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই
আসনে মোট সাতজন প্রার্থী হয়েছেন,তারা হলেন— বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মোল্লা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী ইমদাদুল্লাহ হাশেমী, স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহাজ প্রতীকের দুলাল হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী ওয়াসিম উদ্দিন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী মনিরুজ্জামান চন্দন এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আপেল প্রতীকের প্রার্থী রেহান আফজাল।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, মাদক নির্মূল ও অপরাধ দমনসহ নানা বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী দুলাল হোসেন (জাহাজ প্রতীক)
এবং গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী ওয়াসিম উদ্দিন (ট্রাক প্রতীক)বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
ভোটাররা জানান, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মোল্লা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মুফতী ইমদাদুল্লাহ হাশেমী।বাকি প্রার্থীদের প্রচারণা তেমন চোখে পড়েনি। ফলে বর্তমানে তিন প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু প্রচারণা ও জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে রূপগঞ্জে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে সামাজিক ও জনসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকায় তিনি এলাকায় ব্যাপক পরিচিত। স্থানীয় সন্তান হিসেবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। নিয়মিত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভা করে তিনি ভোটারদের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন এবং এতে ইতিবাচক সাড়া মিলছে বলে ভোটাররা মনে করছেন।
অন্যাদির্কে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মোল্লা সংগঠিতভাবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠন, মাদক ও সন্ত্রাস দমন এবং ভূমিদস্যুমুক্ত রূপগঞ্জ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের অস্থিরতা ও লুটপাটের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি দাড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করছেন। তবে ভোটারদের একাংশের মতে, অতীতে একাধিকবার নির্বাচন করেও তিনি তেমন উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাননি।
হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী ইমদাদুল্লাহ হাশেমীও এলাকায় সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। চরমোনাই পীর মনোনীত প্রার্থী হওয়ায় কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় তার সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ভোটারদের মতে, পুরো রূপগঞ্জ জুড়ে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে।
সব মিলিয়ে ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই—ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ ও মাদকসহ সব ধরনের অপরাধ বন্ধ করে এবং নিরাপত্তা, শান্তি ও সুশাসন নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনকে একটি নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য জনপদে রূপান্তর করা।





