২৮ বছরেও সেবার মান নিশ্চিত করতে পারেনি চারঘাট পৌরসভা, বিবিধ অনিয়মে জর্জরিত

Sanchoy Biswas
ওবায়দুল ইসলাম রবি, রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশিত: ১২:৪৭ অপরাহ্ন, ২২ মে ২০২৬ | আপডেট: ২:২৫ পূর্বাহ্ন, ২৩ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

১৯৯৮ সাল থেকে চারঘাট পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হয়। চারঘাট সূচনা লগ্নে পৌরবাসীর সেবার বিষয়ে তেমন কোনো দাবি না থাকলেও বর্তমান আধুনিক ও ডিজিটাল সময়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এই পৌরসভা। খাতা কলমে “ক” শ্রেণীর হলেও বাস্তবরূপ তার প্রমাণ বহন করে না। ২৮ বছর পার হলেও এখনো সেবার মান নিশ্চিত করতে পারেনি পৌরসভা। বিবিধ অনিয়মে জর্জরিত।

৯ জুলাই ১৯৯৮ সাল প্রকৃতিতে ছিল বর্ষাকাল। প্রমত্তা পদ্মায় মৃদু মন্দ ঢেউ-এ ছিল খুশির নাচন। ঠিক এমনই মাহেন্দ্রক্ষণে চারঘাট উপজেলার ০৫ নং চারঘাট ইউনিয়নের ১০টি মৌজার ১৮.৭৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ৯টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল চারঘাট পৌরসভা। প্রতিষ্ঠাকালীন চারঘাট ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিগত ৩১ মে ২০১১ তারিখে ‘খ’ শ্রেণির পৌরসভায় এবং সর্বশেষ বিগত ১১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে ‘ক’ শ্রেণীর পৌরসভায় উন্নীত হয়।

আরও পড়ুন: ৮০ শতাংশ রোগীর ভরসা শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল

চারঘাট পৌরসভা বাংলাদেশের পশ্চিমাংশে রাজশাহী জেলাধীন অন্যতম প্রসিদ্ধ নদী প্রমত্তা পদ্মার তীর ঘেঁষে লম্বালম্বি অবস্থান করছে। পৌরসভাটি রাজশাহী জেলা শহর হতে প্রায় ৩০.০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ২৪ ডিগ্রি ১৪’ হতে ২৪ ডিগ্রি ২২’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮ ডিগ্রি ৪৬’ হতে ৮৮ ডিগ্রি ৫২’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করছে। পদ্মা নদীর ওপাড়ে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলা। চারঘাট পৌর এলাকার উত্তরে সরদহ ও ইউসুফপুর ইউনিয়ন, দক্ষিণে চারঘাট ইউনিয়ন, পশ্চিমে পদ্মা নদী এবং পূর্বে ভায়ালক্ষ্মীপুর ও সরদহ ইউনিয়ন অবস্থিত।

এই পৌরসভায় মোট সড়ক ১২৫ কি.মি; (বিসি-৮১.০০ কি.মি., আরসিসি/সিসি-৯.৫০ কি.মি., কাঁচা সড়ক ২৪.৫০ কি.মি., এইচবিবি-২.৭৫ কি.মি., বিএফএস-৩.২৫ কি.মি., ডাব্লিউবিএম ৪.০০ কি.মি.), মোট ড্রেন ৪২ কি.মি (আরসিসি ১৯.৯৩ কি.মি., ব্রিকম্যাসনরি ৪.২৮ কি.মি., কাঁচা ১৭.৭৯ কি.মি.), ব্রিজ-০৮টি, কালভার্ট ১৪টি, পানির পাইপ লাইন-৩০ কি.মি., উৎপাদক নলকূপ-০৬টি, পাবলিক টয়লেট-৫৩টি, অনুমোদিত বস্তি-১৪টি। তবে ২০২৬ সালে উন্নয়নে কিছু পরিবর্তন হয়েছে।

আরও পড়ুন: সাভারে মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় আহত দেশ টিভির রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান, আটক ৪

জনশ্রুতি আছে প্রাচীন কালে পদ্মা নদীর চারটি স্টিমার ঘাটের মাধ্যমে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হতো, এজন্য কালক্রমে এ জনপদের নাম চারঘাট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

চারঘাট পৌর পরিসীমার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, অবিভক্ত ভারতবর্ষের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ। এছাড়া রয়েছে সরদহ সরকারি কলেজ, সরদহ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, চারঘাট এম এ হাদী ডিগ্রি কলেজ, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যালয়, চারঘাট মডেল থানা, চারঘাট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও থানাপাড়া সোয়ালোজ। এছাড়া সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য রয়েছে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বীর সেনানী বিজিবির চৌকস দলের সমন্বয়ে বিজিবি ক্যাম্প।

প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ২৫.৫৯ শতাংশ, কৃষিজীবী ও খামারী ২২.৪৩ শতাংশ, সরকারি চাকরিজীবী ১০.৮২ শতাংশ, দক্ষ শ্রমিক ৮.৯৭ শতাংশ, বেকার ৮.৭১ শতাংশ, বেসরকারি চাকরিজীবী ৫.০১ শতাংশ, অদক্ষ শ্রমিক ৪.২২ শতাংশ, রিকশা-ভ্যানচালক ৩.৬৯ শতাংশ, শিক্ষক ৩.৭১ শতাংশ, গৃহপরিচারিকা ২.৬৪ শতাংশ, বড় ব্যবসায়ী ২.৬৩ শতাংশ, হস্তশিল্প ০.৭৯%, শিক্ষার্থী ০.৫৩% এবং হকার ০.২৬ শতাংশ।

“ক” বা প্রথম শ্রেণির পৌরসভার রেকর্ডক্রমে মোট ড্রেন ৪২ কি.মি. থাকলেও ব্যবহারযোগ্য ড্রেন ব্যবস্থাপনায় নেই কোনো সুবিধা। নোংরা পানি, ময়লা আর মশাসহ বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের ভাগাড়। পৌরসভায় মোট সড়ক ১২৫ কি.মি যথাযথ রয়েছে কিন্তু টেকসই নিয়ে থেকে যায় অনেক প্রশ্ন। বর্তমান সরকারের দলীয় তদবিরে ঠিকাদারিত্ব নৈরাজ্যের মাধ্যমে দখলে রয়েছে সকল টেন্ডার। তাদের নিজস্ব লিংকে কাজগুলো হাত বদলে ২ বছরেও টেকসই হচ্ছে না। রাজশাহী সড়ক জনপথ দপ্তরের অধীনে বানেশ্বর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত বাইপাস মহাসড়কে নির্মাণে এই পৌরসভার সিংহভাগ সড়ক, ব্রিজ ও ড্রেন ধ্বংস হয়েছে। যার কোনো সঠিক তথ্য পৌরসভায় রক্ষিত নেই। ইউজিপি এর কোটি কোটি অর্থ ধুলায় মিশে গেছে। যার ভোগান্তি এবং অর্থের ক্ষতির ভাগ জনগণের মাথার ওপর।

পৌরবাসী দিনের বেলায় তাদের কাজের সন্ধানে বের হলেই সড়ক ও জনপথের নির্মিত কালো পিচঢালা সড়কে তাদের গন্তব্যে যেতে পারছে। তবে সন্ধ্যায় এবড়ো-থেবড়ো সড়ক, ড্রেনের পচা পানির গন্ধ আর ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিজ গৃহে প্রবেশ করতে হয়। সড়ক সংলগ্ন বাড়িগুলো তাদের উচ্ছিষ্ট পানি ড্রেনে অপসারণ করতে পারলেও পিছনের বাড়িগুলো ওই সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। রাতের পৌরসভা একটু ভিন্ন। চারঘাট পৌরসভার সদর এলাকায় কিছু আলোর ব্যবস্থা থাকলেও কিছু ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলছে, কিছু মৃদু আলো আর বেশিরভাগ আলোর দেখা মেলে না। রাতের চাঁদের আলোতে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকলেও সকল পৌরবাসী তা ভোগ করতে পারছে না। পৌর আইন বাস্তবায়ন হলে অপ্রতুল সেবাগুলো নিতে পারবে স্থানীয়রা। এটাই “ক” শ্রেণীর পৌরসভা।

শুধু পরিবর্তন হয়েছে পৌর কার্যালয়ের, কার্যালয়ে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে নিজ দলের এবং স্বজনদের। সব মিলিয়ে সেবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পৌরবাসীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিছু অর্থের বিনিময়ে ময়লা সংগ্রহ করছে এবং তা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলছে। ডিজিটাল জন্ম-মৃত্যু কার্ডসহ যাবতীয় সেবা ডিজিটাল হয়েছে। পৌরবাসীর নতুন বাড়ি নির্মাণে নীতিমালা থাকলেও যে যার মতো বাড়ি নির্মাণ করছে। পৌর এলাকার মধ্যে সরকারি জমিগুলো দখল করে নিয়ে অনেকে স্থাপনা নির্মাণ করছে, কেউবা বিভিন্ন কৌশলে নিজের দখলে রেখেছে সরকারি সম্পদ। বরাদ্দ নিয়ে তেমন জটিলতা না থাকলেও বাস্তবায়নে রয়েছে কোটি কোটি টাকার জটিলতা। এই বিষয়ে, গত ৫ আগস্টকে অভিযোগ দিয়ে জবাবদিহিতায় কেউ নেই।

এই বিষয়গুলো নিয়ে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ তথ্য সঠিক এবং তার প্রমাণ বহন করছে নিম্নমানের নির্মাণ উপকরণের মালামাল। স্থানীয়রা বলছেন, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে তারা সেবা পাচ্ছেন না। ঠিকাদার তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করে যাচ্ছে। এর প্রতি উত্তরে মতিন ঠিকাদারসহ অনেক গণমাধ্যমকে বলেন, তারা বর্তমান পৌর প্রকৌশলীর তদারকিতে কাজ করছেন।

প্রসঙ্গত, পৌর প্রকৌশলী আতাউর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদাররা নির্মাণ কাজ করছে। দায়িত্বরত পৌর ঠিকাদারের কাজ পরিচালনা করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। সর্বশেষ প্রকৌশলী বলেন, প্রশাসকের সকল বিষয়ে অবগত আছেন।

চলমান দায়িত্ব নিয়ে বর্তমান পৌর প্রশাসক ও ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, পৌরসভা কর্তৃক সার্বিক সেবার মান নিশ্চিতের লক্ষ্যে সকল কর্মকর্তা একসঙ্গে কাজ করছে। এলাকায় অনেক সমস্যা আছে, তেমনি লোকবল কম রয়েছে। স্থানীয় কিছু লোকের কারণে ড্রেনের পানি অপসারণ করা যাচ্ছে না, সুপেয় পানি সরবরাহের লাইন সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না, বাড়ি নির্মাণের সময় পৌরসভার অনুমতি নিচ্ছে না, ভ্যাট-ট্যাক্স ঠিকমতো দিচ্ছে না।

“ক” শ্রেণির পৌরসভা নিয়ে তিনি বলেন, রাজস্ব আয় ০১ কোটি বা তার বেশি, ট্রাক্স পৌর কর ৮০ শতাংশ বেশি এবং পৌরসভার সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন-ভাতা পরিশোধ যোগ্য হতে হবে। সম্প্রতি সারা বাংলাদেশে ৬৩টি পৌরসভায় নগর পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (আইইউজিপি) এর মাধ্যমে নগর উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।