মুন্সীগঞ্জ সদরে নেই স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড, যাতায়াতে চরম ভোগান্তি
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় গড়ে ওঠেনি একটি আধুনিক ও স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড। অস্হায়ী দিয়েই চলছে বাস সার্ভিস। এতে জেলা শহরের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিদিন চরম দুর্ভোগে পড়ছেন লাখো যাত্রী। রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে কাছের জেলাগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও পরিকল্পিত বাস টার্মিনালের অভাবে যাত্রীদের অস্থায়ী স্থান থেকে বাসে উঠতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন জেলায় আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ হলেও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা এ ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে রয়েছে। জেলা শহরে হাটক্ষীগঞ্জ এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বাসস্ট্যান্ড হিসেবে পরিচিত হলেও সেখানে নেই যাত্রী ছাউনি, টিকিট কাউন্টার, শৌচাগার, পার্কিং কিংবা বাস দাঁড়ানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। ফলে এলাকাটি কার্যত একটি অপরিকল্পিত যানবাহন চলাচলের স্থানে পরিণত হয়েছে। নামেই বাসস্ট্যান্ড হিসেবে পরিচিত। এর উত্তর পাশে পল্লী বিদ্যু সমিতি পাশে রয়েছে সরকারি জমি, একাধিকবার শোনা গেছে ওই স্হানে হবে জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ড? তবে কার্যকর ভূমিকা নেই সংশ্লিষ্টদের।
আরও পড়ুন: ফেনীতে তীব্র গ্যাস সংকট, দুর্ভোগে ক্ষোভ গ্রাহকদের
জানা গেছে, সদর উপজেলার প্রায় কয়েক লাখ মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে নিয়মিত রাজধানী ঢাকায় যাতায়াত করেন। কিন্তু জেলা শহর থেকে সরাসরি বাস ছাড়ার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ যাত্রীকে মুক্তারপুর সেতু এলাকায় গিয়ে বাস ধরতে হয়। অনেকেই আবার নৌ-পথে সদরঘাট বা নারায়ণগঞ্জ ঘাটে গিয়ে সড়কপথে গন্তব্যে পৌঁছান।
প্রতিদিন ঢাকায় যাতায়াতকারী কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ভোরে বের হয়েও বাস ধরতে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। কখনো রিকশা, কখনো অটোরিকশা বদল করে মুক্তারপুর যেতে হয়। এতে সময় ও ভাড়া দুটোই বেড়ে যায়। আমরা শিক্ষার্থী এতে আমাদের লেখাপড়ার ব্যয় অনেক। যদি আমাদের শহরে স্হায়ী বাসস্ট্যান্ড হতো, আমাদের সময় ও অর্থ ব্যয় কম হতো।
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের উদ্বোধন
একজন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার দূরত্ব মাত্র ২২ কিলোমিটার। অথচ বাসস্ট্যান্ড না থাকায় আমাদের অতিরিক্ত ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। প্রতিদিন যাতায়াতকারীদের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক চাপ। আমরা জেলা শহরে বাসস্ট্যান্ড চাই।
এদিকে, একাধিক ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জেলা শহরে একটি আধুনিক বাসস্ট্যান্ড নির্মিত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে আর্থিক ক্ষতি কমবে।
সূত্র জানায়, অতীতের বিভিন্ন জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় একাধিকবার স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড নির্মাণের প্রস্তাব ওঠে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সম্ভাব্য স্থান নিয়েও আলোচনা করেছে। শহরের হাটলক্ষীগঞ্জ এলাকায় পল্লী বিদ্যু সমিতির পাশে নির্মাণের কথাও হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যা এবং প্রকল্প অনুমোদনের অভাবে তা আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে বছরের পর বছর ধরে বিষয়টি কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি হামিদা খাতুল বলেন, মুন্সীগঞ্জ বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা, আগে বিক্রমপুর নাম ছিল। এ জেলা থেকে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ বহু জাতীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন হয়নি। জেলার প্রধান শহরে একটি পরিকল্পিত বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ না হওয়া উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় ব্যর্থতাই রয়েছে।
একাধিক সচেতন নাগরিকের মতে, একটি আধুনিক বাসস্ট্যান্ড নির্মিত হলে শুধু যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে না, একই সঙ্গে যানজট নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং জেলা শহরের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া দূরপাল্লার বাস চলাচল সহজ হবে এবং পর্যটন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মুন্সীগঞ্জে।
স্থানীয় একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, বর্তমান অবস্থায় অসুস্থ রোগী, নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বৃষ্টি কিংবা তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করতে হয় মুক্তারপুর সেতু এলাকায়, সেখানে স্হায়ী বাসস্ট্যান্ড নেই। নিরাপদ যাত্রীছাউনি না থাকায় অনেক সময় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
দিঘীরপাড় পরিবহনের ব্যবস্হাপনা পরিচালক মো. নুর হোসেন বলেন, আমরা ৯০ সাল থেকেই চেষ্টা করছি মুন্সীগঞ্জ শহরে একটি স্হায়ী বাস টার্মিনালের জন্য। এ নিয়ে বিগত সময় একাধিক বার ডিসি অফিসে প্রস্তাব করেছি। শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও কাটাখালী এলাকায় স্হানী বাসস্ট্যান্ড করার কথাও ছিল। তবে আশার আলো ফুটে উঠেনি দুঃখজনক। এখন যদি সংশ্লিষ্ট কর্তাগন ইচ্ছে করে আমরা কোট বা লিচুতলা এলাকায় অস্হায়ী বাসস্ট্যান্ড চালু করতে পারি। এতে ঢাকা যাতায়াতের যাত্রীদের সুবিধা হবে, তবে দাবি স্হায়ী বাসস্ট্যান্ড নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহন করুক সংশ্লিষ্টরা। এখন মুক্তারপুর থেকে দুইটি পরিবহন অস্হায়ী ভাবে সার্ভিস দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মুন্সীগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু চালুর পর জেলার যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাই এখনই একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত বাস টার্মিনাল নির্মাণ সময়ের দাবি।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা উন্নয়ন সভার আলোচনায় নয়, এবার বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হলে জেলার লাখো মানুষের বহু বছরের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
মুন্সীগঞ্জবাসীর প্রশ্ন একটাই—স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও যদি একটি জেলা সদরে স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড গড়ে না ওঠে, তবে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ কবে পাবে?
এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক মো. আরিফ উল ইসলাম বলেন, জেলা বাসস্ট্যান্ড এর বিষয় বিগত সময় একাধিক বার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু একটা সময় এসে মুন্সীগঞ্জের জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে আলোর মুখ দেখেনি।
এর মূল কারন হলো- এখন উন্নয়ন কর্মকান্ডগুলো পরিকল্পনা নেয়ার উদ্যোগ গ্রহন করে প্রশাসন৷ ফলে তারা স্হানীয় নাগরিক প্রতিনিধি সাথে আলোচনা বা সমন্বয় নেই। এজন্যই সঠিক পরিকল্পনা তারা নিতে পারে না। আর এজন্যই জেলারবাসী বঞ্চিত হয়।
এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী বলেন, স্থায়ী বাসস্ট্যান্ডের বিষয়ে কার্যক্রমের আপাতত চিন্তা করছি না। বিশেষ করে রাস্তার যে সংস্কার ও উন্নয়ন সেই কার্যক্রম চলছে। এই কাজ শেষ হলে পরে বাসস্ট্যান্ডের পরিকল্পনা চিন্তা করবো।





