ফেনীতে তীব্র গ্যাস সংকট, দুর্ভোগে ক্ষোভ গ্রাহকদের

Sadek Ali
সুরঞ্জিত নাগ, ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২:৩৩ অপরাহ্ন, ০১ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:৫০ অপরাহ্ন, ০১ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ফেনীতে আবাসিক গ্যাস সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, বরং কয়েক মাস ধরে চলা একটি দীর্ঘস্থায়ী জনদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। জেলার প্রায় ৩২ হাজার আবাসিক গ্রাহক প্রতিদিন গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপের কারণে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। অধিকাংশ এলাকায় দিনের বড় একটি সময় চুলায় আগুন জ্বলে না। কোথাও কোথাও এতটাই কম চাপ থাকে যে ভাত রান্না করতেও কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ফলে নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু আবাসিক গ্রাহক নন, একই সংকটের প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শিল্প ও ব্যবসা খাত আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।

আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের উদ্বোধন

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টানা চার ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যায় না। ভোরে কিছু সময় গ্যাস থাকলেও সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ কমে যায়। সকাল সাতটার পর অধিকাংশ এলাকায় গ্যাস প্রায় থাকে না। দুপুর পর্যন্ত একই অবস্থা বিরাজ করে। অনেক এলাকায় গভীর রাতে কিছুটা গ্যাস মিললেও তখন অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে রান্না করা সম্ভব হয় না।

ফলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়েছে। সকালে অফিস কিংবা স্কুলে যাওয়ার আগে নাস্তা ও দুপুরের খাবার প্রস্তুত করতে না পেরে অনেক পরিবার হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন: মুন্সীগঞ্জ সদরে নেই স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড, যাতায়াতে চরম ভোগান্তি

গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেকট্রিক চুলা কিংবা লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছে। এতে একদিকে যেমন গৃহস্থালির ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ফেনী শহরের পূর্ব উকিলপাড়ার বাসিন্দা ফাহিমা আবেদীন বলেন, "বাসায় গ্যাসের সংযোগ আছে, কিন্তু চুলায় আগুন জ্বলে না। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস ও ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছি। আগে যে খরচে মাস চলত, এখন তার কয়েক গুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে।"

আলোকদিয়া গ্রামের বাসিন্দা কাজী রিয়াজ বলেন, "রাত ১২টার দিকে গ্যাস আসে, আবার সকাল ৬টার দিকে চলে যায়। পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে থাকার সময় গ্যাস আসে, আর প্রয়োজনের সময় থাকে না। তাই এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এতে একদিকে লাইনের গ্যাসের বিল, অন্যদিকে সিলিন্ডারের খরচ—দুই ধরনের ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।"

কদলগাজী এলাকার বাসিন্দা প্রকৌশলী শাহাবুদ্দিন বলেন, "এটি এক-দুই দিনের সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থা চলছে। বিভিন্ন সময় আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।"

আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা অপর্ণা নাথ বলেন, "গ্যাস তো যায় না, কালে-ভদ্রে আসে। সংযোগ আছে, কিন্তু ব্যবহার করতে পারি না। তারপরও প্রতি মাসে বিল দিতে হচ্ছে।"

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেনী শহরের পূর্ব উকিলপাড়া, পেট্রোবাংলা এলাকা, বাঁশপাড়া, সহদেবপুর, আলোকদিয়া, পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার, রামপুরসহ শহর ও আশপাশের অধিকাংশ এলাকায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

কোথাও গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্না করতে স্বাভাবিক সময়ের তিন থেকে চার গুণ বেশি সময় লাগে। আবার অনেক এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় আগুনই জ্বলে না।

পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার এলাকার এক ভবনের মালিক জানান, তার সাততলা ভবনে ১৪টি গ্যাসের চুলা রয়েছে। প্রতিদিনই ভাড়াটিয়ারা গ্যাস না থাকার অভিযোগ করেন। বহুবার গ্যাস অফিসে যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাননি। এতে অনেক ভাড়াটিয়া গ্যাস বিল দিতেও অনীহা প্রকাশ করছেন।

গৃহিণীরা জানান, সকালে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর আগে নাস্তা তৈরি করা এবং কর্মজীবী সদস্যদের জন্য দুপুরের খাবার প্রস্তুত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অনেক পরিবার রাতে গ্যাস এলে আগেভাগে রান্না করে সংরক্ষণ করছেন। কিন্তু এটি স্বাস্থ্যসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার অনেকেই প্রতিদিন বাইরের খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা একদিকে ব্যয়বহুল, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

গ্যাস সংকটের কারণে জেলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতির মুখে পড়েছে। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ব্যবসায়িক ক্ষতি বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করছে, যা উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতায় ফেনী জেলায় প্রায় ৩২ হাজার আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এসব গ্রাহক প্রতি মাসে নির্ধারিত বিল নিয়মিত পরিশোধ করলেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছেন না।

গ্রাহকদের অভিযোগ, সেবা না পেলেও বিল আদায়ে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। অথচ সমস্যার সমাধানে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।

একাধিক গ্রাহক বলেন, গ্যাস না থাকলে অন্তত বিলের ক্ষেত্রে কিছুটা সমন্বয় বা বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু সে ধরনের কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।

দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সংকটে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গ্যাস সংকট নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ প্রকাশ করছেন গ্রাহকরা।

অনেকেই বলছেন, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার কথাও ভাবছেন ভুক্তভোগীরা।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ফেনী কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান বলেন, "ফেনীর পুরোনো সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় গ্যাসের স্বল্পচাপের সমস্যা তৈরি হয়েছে।"

তবে কবে নাগাদ এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কিংবা নতুন সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেনীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও আবাসিক সংযোগের তুলনায় বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো অনেক পুরোনো এবং অপ্রতুল। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পাইপলাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করলে এ ধরনের সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

তাদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে চাপ বাড়িয়ে নয়, বরং পুরো বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পুরোনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

ফেনীবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এ দুর্ভোগের দ্রুত অবসান ঘটাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে। কারণ গ্যাস শুধু একটি জ্বালানি নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রতিদিন গ্যাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, অতিরিক্ত খরচে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন—এসব থেকে মুক্তি চান ফেনীর ৩২ হাজার আবাসিক গ্রাহক। তাদের একটাই দাবি—নিয়মিত বিলের বিপরীতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বহু বছরের এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান।