গাজীপুর সদর উপজেলায় জালিয়াতির মাধ্যমে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি খারিজের অভিযোগ, মামলা বিচারাধীন
গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দলিলের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের জমি জালিয়াতির মাধ্যমে খারিজ (নামজারি) করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কথিত দলিল সৃষ্টি করে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ জমির এই নামজারি করা হলেও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালত তা বাতিল করেন। বর্তমানে মামলাটি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে আপিল হিসেবে বিচারাধীন রয়েছে।
ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বাড়িয়া ইউনিয়নের জোত নম্বর ৮৫৪-এর অধীন প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ জমির ওপর ৮৬৩/২০১৩-১৩ নম্বরে নামজারি জমাভাগের আদেশ জারি করা হয়েছিল। এই আদেশ বাতিলের দাবিতে ভুক্তভোগী পক্ষ ২০২০ সালে গাজীপুর সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতে ১৫৫/২০২০ নম্বরে একটি বিবিধ মোকদ্দমা দায়ের করে।
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের সমাপনী
দীর্ঘ শুনানি ও তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এসি (ভূমি) আদালত সংশ্লিষ্ট নামজারি ও জমাভাগের আদেশ বাতিল ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে রায়ের বিরুদ্ধে বিবাদীপক্ষ ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে ১১/২০২৪ নম্বরে আপিল দায়ের করে, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
আপিল শুনানির অংশ হিসেবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতের নির্দেশে সদর এসি (ভূমি) অফিসের সার্ভেয়ার ফারুক আহমেদ সম্প্রতি জমিটি সরেজমিনে তদন্ত করেন। তদন্তে জানা যায়, জমিটির মালিকানা দাবিদার বাড়িয়া ইউনিয়নের কেশুরিতা গ্রামের হাসান উদ্দিন রেকর্ডীয় হিন্দু মালিকদের নিকট থেকে জমি হস্তান্তরের পক্ষে কোনো ধারাবাহিক বা উপযুক্ত দলিল উপস্থাপন করতে পারেননি।
আরও পড়ুন: অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অন্যান্য জেলাও রক্ষা পাবে
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, জালিয়াতির মাধ্যমে পিছুনী দাস নামের এক ব্যক্তিকে দাতা এবং হাসান উদ্দিনের পিতা আলতাফ উদ্দিন আহমেদকে গ্রহীতা দেখিয়ে ১৯৭২ সালের ২৯ এপ্রিল ২৫৫৪ নম্বর একটি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ৮ মার্চ আলতাফ উদ্দিন ৩৯০৮ নম্বর বণ্টননামা দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তিটি তার সন্তানদের মাঝে বণ্টন করেন।
তাদের ভাষ্যমতে, ২০১৯ সালে রেকর্ডীয় মালিকদের উত্তরাধিকারীরা জমি নামজারি করতে গেলে ওই দলিলের অসঙ্গতি প্রকাশ পায়। ২৫৫৪ নম্বর দলিলে পিছুনী দাস কীভাবে মালিকানা অর্জন করলেন বা কার কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছেন, তার কোনো তথ্য বা বৈধ দলিলের অস্তিত্ব মেলেনি।
ভুক্তভোগী কানচলা চন্দ্র দাস বলেন, “একটি ভুয়া মালিকানাকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে আমরা বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হচ্ছি। সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডে আমাদের মালিকানা থাকা সত্ত্বেও বৈধ দলিল ছাড়াই জমি কেটে নামজারি দেওয়া হয়েছে। সেই নামজারি বাতিল করতে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে আদালত ও ভূমি অফিসে ঘুরতে হচ্ছে।”
একই গ্রামের অস্তিত্বহীন এক ব্যক্তি জংশর আলী তার নামে হরনাত চক্রবর্তীর রেকর্ডীয় জমি এবং সরকারি জমি নামজারি করে ক্রয়-বিক্রয় করছে। ভুক্তভোগীরা এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ধারণা, রেকর্ডীয় মূল মালিকের নামে সরাসরি দলিল তৈরি করলে জালিয়াতির মামলা হওয়ার ঝুঁকি থাকায় অস্তিত্বহীন এক ব্যক্তির নামে ভুয়া দলিল সৃজন করে মালিকানা দাবি করা হয়েছে। এটি একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতির কৌশল বলে তাদের দাবি।
এ বিষয়ে সদর এসি (ভূমি) অফিসের সার্ভেয়ার ফারুক আহমেদ জানান, “অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতের নির্দেশে আমি জমিটি সরেজমিনে তদন্ত করেছি। তদন্তকালে আপিলকারী হাসান উদ্দিন রেকর্ডীয় মালিকদের নিকট থেকে জমি প্রাপ্তির কোনো ধারাবাহিক দলিল দেখাতে পারেননি। তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈধ দলিল প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রেকর্ডীয় মালিকদের জমি ফেরত পাওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।





