৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পাস কাঠমিস্ত্রি নাসিমুল, ‘পড়ালেখার কোনো বয়স নেই’

Any Akter
গর্বিতা রানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১:০৫ অপরাহ্ন, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২:০৩ অপরাহ্ন, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

২০০২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর দারিদ্র্যের চাপে পড়াশোনা থামিয়ে দিতে হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে দুই যুগেরও বেশি সময়। সংসার, সন্তান আর কাঠমিস্ত্রির কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও মনের ভেতর থেকে লেখাপড়ার স্বপ্নটা হারিয়ে যায়নি। সেই স্বপ্ন পূরণে ২০২৪ সালে আবার নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন ৪৩ বছর বয়সী মো. নাসিমুল হক। এবার ৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৬২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার গোহালবাড়ি ইউনিয়নের সুরানপুর তিলোকী গ্রামের বাসিন্দা নাসিমুল হক পেশায় কাঠমিস্ত্রি। পাশাপাশি তিনি ভোলাহাট উপজেলা ফার্নিচার শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক।

 কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে তাঁর এই সাফল্যে পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন: মুন্সীগঞ্জে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগে ফার্মেসিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা

সোমবার এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নাসিমুলের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। বয়সকে বাধা না মেনে তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার গল্প এখন অনুপ্রেরণা দিচ্ছে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া অনেক মানুষকে।

নাসিমুল হক বলেন, ‘আমি ২০০২ সালে বাচ্চামারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। তখন পরীক্ষায় ফেল করায় এবং দারিদ্র্যের চাপে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। খাতা-কলমে লেখাপড়া ছেড়েছিলাম, কিন্তু মনের ভেতর থেকে কখনো ছাড়িনি।’

আরও পড়ুন: মিয়ানমারে ইউরিয়া সার পাচারকালে আটক ৪

এরপর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হন নাসিমুল। একসময় কমিটির অন্য সদস্যরা তাঁকে সভাপতি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষাগত সনদ না থাকায় সে সুযোগ হয়নি। বিষয়টি তাঁকে ভীষণ কষ্ট দেয়।

নাসিমুল বলেন, ‘সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখন আবার এসএসসি সার্টিফিকেট অর্জনের আশায় ২০২৪ সালে রাজশাহী কমার্স কলেজ (ভোকেশনাল) -এ নবম শ্রেণিতে ভর্তি হই। এ বছর এসএসসিতে জিপিএ-৪.৬২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। এতে আমি খুবই খুশি। এই আনন্দ আপনাদের ভাষায় বোঝাতে পারব না।’শুধু সনদ অর্জনেই থামতে চান না নাসিমুল। ভবিষ্যতে আরও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান তিনি। এসএসসি পরীক্ষায় একবার ফেল করলে লেখাপড়া শেষ—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আমার মতো যারা ঝরে পড়েছেন, তাঁরাও আবার লেখাপড়া করতে পারবেন। পড়ালেখার কোনো বয়স নেই।’

নাসিমুলের সহকর্মী কাঠমিস্ত্রি তুহিন আলী বলেন, ‘নাসিমুল ভাই আর আমি একসঙ্গে কাজ করি। কাজ করার পাশাপাশি তিনি পড়ালেখা করেছেন। ৪৫ বছর বয়সে এ বছর এসএসসি পাস করেছেন। তাঁর সাফল্যে আমরা গর্বিত। তিনি ভোলাহাটবাসীর গর্ব।’

ভোলাহাট উপজেলা ফার্নিচার শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. লোকমান আলী বলেন, ‘কাজ করলে পড়ালেখার ক্ষতি হয় না। সংসারের দায়িত্ব পালন করেও একজন মানুষ ৪৫ বছর বয়সে পড়াশোনা করে ভালো ফল করতে পারেন—নাসিমুল হক তার উদাহরণ। তাঁর এই অর্জনে আমরা আনন্দিত এবং তাঁকে অভিনন্দন জানাই।’

নাসিমুলের স্ত্রী মোসা. ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী দিনে কাজ করেছে, রাতে পড়াশোনা করেছে। এসএসসি পাস করেছে, এতে আমি খুব খুশি। তাঁর পড়ালেখা এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের সহযোগিতা চাই।’

গোহালবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলী বলেন, ‘একজন কাঠমিস্ত্রি ৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করেছে—এটা আমার খুব ভালো লাগছে। নাসিমুল আমার খুব প্রিয় মানুষ। আমি বিভিন্ন সময় তাকে পড়ালেখায় উৎসাহ দিয়েছি। তার পড়ালেখার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘নাসিমুল দিন আনে দিন খায়। কাজ করে পড়াশোনা করেছে। এই বয়সে তার এসএসসি পাস করা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। বিশেষ করে যারা পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছেন বা ঝরে পড়েছেন, তাঁদের জন্য এটি বড় অনুপ্রেরণা। তাঁর পড়াশোনা এগিয়ে নিতে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। শিগগিরই তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।’

দুই যুগ আগে থেমে যাওয়া পড়াশোনা শেষ পর্যন্ত যে শেষ হয়নি, নাসিমুল হকের সাফল্য যেন তারই প্রমাণ। কাঠের ফার্নিচার বানানোর ফাঁকে খাতা-কলম হাতে তুলে নিয়ে তিনি দেখিয়েছেন—ইচ্ছা থাকলে বয়স কিংবা জীবনের ব্যস্ততা শিক্ষার পথে চূড়ান্ত বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।