২১ ফেব্রুয়ারী : ইতিহাস-বাস্তবতার আড়ালে পূর্ণতা কতটুকু

Sanchoy Biswas
মবিনুল ইসলাম রাশা, গবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৪:৫৮ অপরাহ্ন, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রতিটি জাতিসত্তার মূখ্য পরিচায়ক তার ভাষা। এই ভাষাই তার মনের ভাব প্রকাশের সহজাত মাধ্যম। যখন বাংলার উদ্যান ছেয়ে যায় ফাগুনের লাল আভায় ঠিক তখনই জাতির অস্তিত্বের সংগ্রামকে স্মরণ করিয়ে আসে ২১শে ফেব্রুয়ারী। ভাষার মাসে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের ভাবনা। পাঠকের জন্য তা তুলে ধরেছেন মবিনুল ইসলাম রাশা, গবি প্রতিনিধি।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ধ্রুব সত্য 

আরও পড়ুন: চবিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে সিন্ডিকেট: অন্তরালে বিতর্কিত নিয়োগের কারসাজি

২১ এ ফেব্রুয়ারীর এ দিনটিতে খালি পায়ে যে ধুলো লাগে, সে ধুলো যেমন অনুভব করায়, এ মাটি এ আশ্রয় যেমন এসেছে রক্তের বিনিময়ে। তেমনি নিজস্ব মাতৃভাষা স্থাপনে রয়েছে রফিক, জব্বার, সালাম সহ অন্যান্য ভাষা শহীদদের অবদান৷ কেবল প্রতিবছরের একটি দিন নয় বরং মুখের ভাষার ইতিহাস চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের সাহসিকতা। তাঁরা আজও যেন প্রতিটি বাঙালির মুখে মুখে এবং হৃদয়ে মহিমান্বিত হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের এ ইতিহাস ধ্রুব সত্য সাথে সত্য, সেই ভাষা শহিদদের প্রাণ।সেই বাংলা ভাষা এখন শুধু ব্যবহারের কাজে নেই এর অগ্রগতি প্রযুক্তিগত ভিত্তিতে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে৷ বিপুল সংখ্যক সফটওয়্যার, টুল, কিবোর্ড, শিক্ষা সফটওয়্যার, ডেটাসেট যেমন, 

অভ্র, রিদমিক, বাংলা TTS, Bangla Academy Dictionary 

আরও পড়ুন: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পরিদর্শনে ঢাবি উপাচার্য

এসব প্রকল্প বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করছে। তবে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব মঞ্চে উপস্থাপনের জন্য দরকার বিশেষ বিশেষ গবেষনা, সৃষ্টিশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন ভাবনায় নানান জনরার বই এবং টুলস, যা সৃষ্টিতে অবিস্মরনীয় ভুমিকা রাখতে পারে আজকের শিক্ষার্থীরা-ই, তারাই পারে বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে বর্হিবিশ্বের সামনে মেলে ধরতে। ভালো ভালো লেখাপত্র, এবং গবেষনা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারলে আজ থেকে বিশ, ত্রিশ বছর পর গিয়ে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি অনন্য পর্যায়ে উপনীত হবে। 

ফাহমিদা আফরিন সূচনা 

বাংলা বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

একুশ আমাদের অস্তিত্বের লড়াই

"একুশে ফেব্রুয়ারি" এই শব্দগুলো শুনলেই গা ছমছম একটা ভাব চলে আসে। মনে পড়ে যায় সেই শৈশবের প্রভাত ফেরীর কথা সাথে খালি পা , হাতে ফুলের তোড়া এবং মুখে সাহসী স্লোগান। বায়ান্নর কথা মাথায় আসলেই মনে পড়ে যায় এটা শুধু একটা ভাষা আন্দোলনই নয় বরং বাঙ্গালীর অস্তিত্বের আন্দোলন। প্রত্যেকটা মানুষই তার মনের ভেতরের মানুষটাকে জাগ্রত করে নিজের মায়ের ভাষায় ভেবে। সেই বায়ান্নর ইতিহাস মনে পড়লেই ভাবি যে নিজের মায়ের ভাষার জন্য এতগুলো তাজা প্রাণ বলি দিতে হলো? প্রশ্ন টা সামনে আসলেই খুব ভয় পেয়ে যাই। আর বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আমরা বাংলিশ সংস্কৃতিতে এগিয়ে যাচ্ছি, এতে করে আমাদের শেকড় নিয়ে টানাটানির একটা বেহাল অবস্থা মনে হয়। আমাদের সকলের উচিত আমাদের ভাষায় লেখা, বই পড়া এবং নিজের মনের ভাব প্রকাশ করা। তাতেই আমাদের বায়ান্নর শহীদরা সম্মানিত হবেন। একুশের শহীদদের এই আত্মত্যাগ শুধু ফেব্রুয়ারি তেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয় বরং তাদের প্রতি সম্মান রেখে আমাদের সবসময় বাংলায় সত্য কথা, বাংলায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় যেনো আমাদের মূল লক্ষ্য থাকে। এটাই হবে শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। 

অর্ণব ভৌমিক 

ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সাইন্সেস অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

ভাষার শুদ্ধ প্রসার ঘটাতে হবে 

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষাই একটি জাতির আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের প্রতীক। ২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত সেই অমূল্য অধিকারকে, যার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি। ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা আজ বিশ্বদরবারে এক শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করেছে। ভাষার জন্য জীবনদানের ইতিহাস বিশ্ববাসীকে ভাষাগত অধিকার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব শেখায়। এতে বাংলা কেবল আবেগের নয়, প্রতিবাদ ও চেতনার ভাষা হিসেবেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ক্যাম্পাস ও বন্ধুদের আড্ডায় শুদ্ধ বাংলা চর্চা অপরিহার্য। আধুনিকতার সাথে চলতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দ ব্যবহারে আমরা ভাষার মাধুর্য হারাচ্ছি, যা সচেতন চর্চার মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব।

উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার বাড়াতে তরুণদের উদ্যোগী হতে হবে—বাংলায় গবেষণা, দাপ্তরিক কাজে বাংলা প্রয়োগ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মানসম্মত কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে। ভাষার প্রতি দায়িত্ববোধই পারে বাংলাকে গৌরবের শিখরে পৌঁছে দিতে। ব্যক্তিজীবন থেকে রাষ্ট্রীয় পরিসর পর্যন্ত সর্বত্র বাংলার সঠিক ও সম্মানজনক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাস্তব রূপ পাবে। 

মনিরা জামান তনু 

বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়। 

মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে 

ভাষার জন্য  রাজপথে রক্ত দিয়ে আমরা "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই"  দাবি আদায় করেছি সত্য, কিন্তু আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সব স্তরে বাংলার সঠিক প্রয়োগ এখনো অনেক দূরে। কাগজে কলমে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলেও আমাদের দৈনন্দিন ও দাপ্তরিক জীবনে এর পূর্ণ প্রতিফলন ঘটছে না। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত বা কর্পোরেট সমাজে বাংলা বলাকে অনেকে নিচু চোখে দেখেন। এই যে নিজের ভাষার প্রতি অবজ্ঞা, এটাই বাংলাকে সর্বস্তরে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। এখনো আমাদের দেশের উচ্চতর বিজ্ঞান, চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিদ্যার বইগুলো মূলত ইংরেজিতে। এমনকি বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে ভেতরের সব কাজই চলে ইংরেজিতে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই বাংলার চেয়ে ইংরেজির প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে। বর্তমানে নাটক, সিনেমা এবং এফএম রেডিওতে এক ধরণের জগাখিচুড়ি ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি মেশানো) ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। তরুণ প্রজন্ম মনে করছে এটাই বুঝি আধুনিকতা। এর ফলে শুদ্ধ বাংলা ভাষা তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি পর্যায়ে বাংলাকে ভালোবেসে গ্রহণ করতে হবে। যতক্ষণ না আমরা গর্বের সাথে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা ও কাজ করা শুরু করব, ততক্ষণ সর্বস্তরে বাংলার প্রয়োগ কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।

রাব্বি ইসলাম রনি 

রসায়ন বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।