হুতিদের ঠেকাতে সৌদির পক্ষে যুদ্ধে নামছে আরব আমিরাত

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:৩৮ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৩:৩৮ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে আবারও সংঘাতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ইয়েমেনের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলে হুতিবিরোধী সরকারি বাহিনীর একটি অংশকে আবারও অর্থায়ন শুরু করতে সম্মত হয়েছে আমিরাত। এর বিনিময়ে ওই বাহিনীকে আকাশপথে নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি আরব।

ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ দূর হওয়ার ক্ষেত্রে এই সমঝোতাকে প্রথম বাস্তব অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইয়েমেনজুড়ে হুতিদের অগ্রযাত্রা উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর শাসকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

আরও পড়ুন: জেএনজি আন্দোলনে এবার উত্তাল ফ্রান্স থেকে আর্জেন্টিনার ৮ দেশ

হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরবকে প্রতিদিনই নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। এসব হামলায় দেশটির বিমানবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোর কিছু অংশের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

দক্ষিণ ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মধ্যে জায়ান্ট ব্রিগেডস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি। অতীতে এই বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করত আমিরাত। হুতিবিরোধী বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে তাদের তুলনামূলক কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে গত জানুয়ারিতে ইয়েমেনের ভেতরে সামরিক কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে আমিরাত তাদের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়।

আরও পড়ুন: তেলাপোকার পর মোদির বিরুদ্ধের এবার নামছে ‘মাছি জনতা পার্টি’

দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটের আহ্বান

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চলতি সপ্তাহে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। এতে ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে থাকা উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের পুরোনো সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে সৌদি আরব ও আমিরাত—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত এ দাবির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) বাহিনীও এখন পর্যন্ত সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে সম্মত হয়নি। সৌদি আরব গণভোটের অনুমতি দিলে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইয়েমেনের জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকার গত সপ্তাহে রাজধানী সানা থেকে হুতিদের হটাতে পাল্টা অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। তবে মারিবের কাছে মাজজার এলাকা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে এ অভিযানে এখন পর্যন্ত সীমিত অগ্রগতি হয়েছে।

এসটিসি নেতা এইদারুস আল-জুবাইদি ও সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও নেই। দক্ষিণ ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা এবং দুই বছরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনার পর গত জানুয়ারিতে জুবাইদি আবুধাবিতে পালিয়ে যান। এর জবাবে সৌদি আরব এসটিসির জন্য পাঠানো আমিরাতের অস্ত্রবাহী চালানে বোমা হামলা চালায়।

এরপর আমিরাত ইয়েমেনের সংঘাতে সব ধরনের সম্পৃক্ততা বন্ধের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার জুবাইদিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানায়।

হুতিদের হামলায় এডেন বিমানবন্দরও লক্ষ্যবস্তু

ইয়েমেনের সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে আমিরাতের কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও হুতিরা শেষ পর্যন্ত তাইজ ও মারিব দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শহর দুটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুক্রবার হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে। তখন একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-ইরিয়ানি জানান, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ইয়েমেনিয়া এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে এবং রানওয়ের মধ্যবিন্দু থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে পড়ে।

এর আগের দিন এডেনে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে হুতি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সৌদি আরবকে সহায়তার প্রস্তুতি মিসরের

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় দেশটির সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে তিনি পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন ডাকছেন।

তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, মিসর কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপ নেবে না। দেশটির ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকবে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার মধ্যে।

এদিকে সৌদি আরবকে আরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের মধ্যেও আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি ভয়েজার আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ পাঠানো হয়েছে। তবে আঞ্চলিক কূটনীতিকেরা মনে করছেন, যুক্তরাজ্যের আরও সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ওমান ও কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সমন্বয় বাড়ানো উচিত কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

সৌদি অভিযানে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নিয়ে আইনি প্রশ্ন

সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান অভিযানে যুক্তরাজ্যের ব্যাপক সমর্থন দেওয়ার আইনি দিকও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত রায় দিয়েছিল, ২০১৫-১৬ সালে ইয়েমেনে সৌদি আরবের আগের বোমা হামলা অভিযানের সময় অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার আইন লঙ্ঘন করেছিল।

ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট আর্মস ট্রেড নামের একটি সংগঠনের অভিযোগ ছিল, সৌদি আরব আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে—এমন ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাজ্য যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। ওই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকারকে অস্ত্র রপ্তানির মূল্যায়ন পদ্ধতি সংশোধন করতে হয়।

সৌদি আরবের দাবি, এরপর থেকে তাদের সামরিক কার্যক্রমের পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। দেশটি আরও বলছে, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই তারা অভিযান চালাচ্ছে।

গত ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রেসিডেন্সিয়াল বিবৃতি গ্রহণ করে। এতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়।

সংঘাতে বাস্তুচ্যুত দুই লাখের বেশি মানুষ

গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনের যুদ্ধে মোট কতজন নিহত হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

এতে এডেনভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান