গ্রেফতারের আগে দেড় বছর কোথায় ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী?
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দেড় বছরেরও বেশি সময় পর তাকে গ্রেফতার করা হলো।
মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতারের পর নেওয়া হয় ঢাকার মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিবি কার্যালয়ে।
আরও পড়ুন: ড. খলিলের দিল্লি সফরে ঢাকা-দিল্লি কূটনীতিতে নতুন মাত্রা হচ্ছে
ঢাকা ও রংপুরে জুলাইয়ের একাধিক হত্যা মামলায় মিজ চৌধুরীর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
"এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকার লালবাগ থানায় হওয়া একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আমরা তাকে কোর্টে চালান দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি," বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম।
আরও পড়ুন: ১২ এপ্রিল থেকে সারাদেশে বিক্ষোভের ডাক ১১ দলীয় জোটের
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় স্পিকার পদ থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী সরে দাঁড়ান বলে জানিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
এরপর গত দেড় বছরে তাকে আর প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। এই সময়ের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানান গুঞ্জন শোনা গেছে।
কিন্তু মিজ চৌধুরী এতদিন কোথায় ছিলেন এবং মঙ্গলবার কীভাবে পুলিশের কাছে ধরা পড়লেন?
'আত্মগোপনের' দেড় বছর
গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের মুখে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকে গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান। গ্রেফতারও হন অনেকে।
জনরোষে প্রাণহানির আশঙ্কায় সেসময় অনেকে বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন।
তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিলেন বলে ২০২৪ সালের ১৮ই অগাস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
"মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে ও আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে জীবন রক্ষা করতেই" তাদেরকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বলে আইএসপিআরের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
প্রাথমিকভাবে সবার নাম পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও বছরখানেকের মাথায় গত বছরের ২২শে মে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সেই তালিকায় আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতাদের সঙ্গে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল।
সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সপরিবারে ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
সেখানে থাকা অবস্থাতেই ২০২৪ সালের দোসরা সেপ্টেম্বর মিজ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান বলে ধারণা করা হয়।
কীভাবে তিনি সেনানিবাসে গিয়েছিলেন, সেটির একটি বর্ণনা পাওয়া যায় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি জবানবন্দিতে।
গত বছরের এপ্রিলে মি. পলক আদালতকে জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের দিন সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ তারা প্রায় ১২ জন জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের একটি কক্ষে "লুকিয়ে ছিলেন"।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনী সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যান বলে জানান মি. পলক।
কিছুদিন পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিকালে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
থেকে গ্রেফতার হন।
কিন্তু শিরীন শারমিন চৌধুরীর কোনো খোঁজ তখন পাওয়া যায়নি।
তিনি কতদিন সেনানিবাসে ছিলেন এবং কবে বের হন, সে বিষয়েও আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
প্রায় দেড় বছর পর 'গোপন তথ্যের ভিত্তিতে' মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার নিজ বাসা থেকে মিজ চৌধুরী গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জানতে পেরেছেন যে, সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার পর দেশের ভেতরেই বিভিন্ন জায়গায় 'আত্মগোপনে ছিলেন' শিরীন শারমিন চৌধুরী।
"উনি বলছেন যে, এতদিন দেশেই ছিলেন। যে বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটা তার স্বামীর নামে বলে জানতে পেরেছি। ধরা পড়ার আগে তিনি কোথায় কোথায় ছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম।
মঙ্গলবার আদালতে তোলার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিজ চৌধুরীর রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
যত মামলা
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ অন্তত অর্ধ ডজন মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে শিরীন শারমিন চৌধুরীর।
এর মধ্যে একটি রংপুরের শ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলা। এজাহারের তথ্য থেকে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তিনি নিহত হন।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৭শে অগাস্ট নিহতের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
সেখানে শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়।
মি. মুনশিকে আগেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
ঢাকার লালবাগ থানাতেও জুলাইয়ের একটি হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে মামলাটিতেই গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হচ্ছে তাকে। তবে অন্য মামলাগুলোতেও পর্যায়ক্রমে মিজ চৌধুরীকে গ্রেফতার দেখানা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী।
এরপর মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
নবম সংসদের শেষ দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেসময়ের স্পিকার আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রপতি বানায় আওয়ামী লীগ সরকার।
এরপর ২০১৩ সালে ৩০শে এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী।
২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত মিজ চৌধুরী টানা তিন মেয়াদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা





