রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়ছেন আজ
নানা জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আজ শুক্রবার পদত্যাগ করে বিকেলে বঙ্গভবন ছাড়ছেন। স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলেও তিনি আপাতত গুলশানের বাসায় উঠছেন। তাকে আগামী ৬ মাস এসএসএফ নিরাপত্তাসহ সাবেক রাষ্ট্রপতিদের প্রযোজ্য সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বঙ্গভবন ও রাষ্ট্রপতির নির্ভরযোগ্য ও ঘনিষ্ঠ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ পত্র জমা দেয়ার সাথে সাথেই পদটি শূন্য হবে এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুলাই সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের বিষয়টি অবহিত করেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সম্মতির বার্তা পেয়ে রাষ্ট্রপতিও এরই মধ্যে পদত্যাগের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তার নিয়োজিত ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বঙ্গভবন ত্যাগ করার নির্দেশনা দেন। রাষ্ট্রপতিও গুলশানে তার বাসভবন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেওয়া শুরু করেন। রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, শুক্রবার জুমার নামাজের আগেই তিনি পদত্যাগ পত্র জাতীয় সংসদের পিকারের কাছে পাঠিয়ে দিবেন। দুপুরের পর বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানের বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সূত্রটি। গুলশানের বাসবনটি এসএসএফের নিরাপত্তার আওতায় দেওয়া হয়েছে। আগামী ৬ মাস এসএসএফ-সহ অন্যান্য সব সরকারি সুবিধা সাহাবুদ্দিন পাবেন বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে ৫০ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষর যুক্ত পত্রযোগে নিজ পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগ পত্র জমা হওয়ার পরই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে এবং স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। পদত্যাগজনিত কারণে পদ শূন্য হলে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বর্তমান মন্ত্রী পরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারের সম্ভাব্য নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে বিশিষ্টজনেরা।
এদিকে, গত বুধবার (২২ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের লেখেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।’ তবে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে এখন পর্যন্ত বঙ্গভবন কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা বা বক্তব্য দেওয়া হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে এই পোস্টের পরই শুরু হয় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নানা আলোচনা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া আলোচনাকে ‘গুঞ্জন’ বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত বা অন্য কোনো কারণে পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সে সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকার কিছু জানে না এবং সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: নারকোটিক্স নির্বাহী অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। সেটি যদি ঘটনা হয়, তখন আমরাও দেখব। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত কিংবা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব ছাড়তে চান, তাহলে সাংবিধানিকভাবে সে সুযোগ রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখানে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। তিনি (রাষ্ট্রপতি) স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন কিনা, সেটি তাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কোনো ফোনালাপ হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে নিয়ম অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। এরপর পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সাংবিধানিকভাবে অপশন আছে। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। আমিও পত্রিকায় এসব খবর দেখছি। তিনি যদি পদত্যাগ করতে চান, তাহলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেওয়ার নিয়ম আছে। এরপর রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেটি পরে দেখা যাবে।
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সাংবিধান অনুযায়ী, তার ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সেই সময় ফ্যাসিবাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। পরবর্তী সময়ে সংসদ বিলুপ্ত, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগুলোতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি তুলেছিলেন আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা। তার পদত্যাগ দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শোনা যায় সাংবিধানিক শূন্যতার আশঙ্কায় তখন বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ চায়নি।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দেশে ফিরছেন স্পিকার
তবে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পদত্যাগ করতে চান। সেই সময় তিনি আরও বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন। এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, অন্যথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। যদিও সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছিল, সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তার পদত্যাগ দাবি করেনি। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে।





