কুরবানি কাদের ওপর ওয়াজিব? জেনে নিন নেসাব
কুরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও তাকওয়ার বাস্তব প্রকাশ। প্রতি বছর জিলহজ মাস ঘনিয়ে এলে মুসলমানদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—কতটুকু সম্পদ থাকলে কুরবানি ওয়াজিব হয়?
অনেকেই মনে করেন, কেবল ধনী ব্যক্তিদের জন্যই কুরবানি ফরজ বা ওয়াজিব। আবার কেউ কেউ নিজের সম্পদের সঠিক হিসাব না জানার কারণে দ্বিধায় থাকেন। অথচ ইসলাম অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে কুরবানির সামর্থ্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে।
আরও পড়ুন: রেজাউল করিম খান চুন্নুর মায়ের ইন্তেকাল
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে কুরবানির নেসাব, কার ওপর কুরবানি ওয়াজিব এবং এ বছর আনুমানিক কত টাকা থাকলে কুরবানি দিতে হবে—তা নিচে তুলে ধরা হলো।
কুরবানি কার ওপর ওয়াজিব?
আরও পড়ুন: সেভয়ের ডিস্কোনে নতুন ভ্যারিয়েন্ট, কুকিজ-ব্রাউনি ও ক্যারামেলের রিচ স্বাদ
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ফজর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যেসব শর্ত পূরণ হবে এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন, তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।
শর্তগুলো হলো—
- মুসলিম হতে হবে
- প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে
- কুরবানির দিনগুলোতে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি কর।”
(সুরা আল-কাউসার: ২)
কুরবানির নেসাব কত?
কুরবানির নেসাব নির্ধারণ করা হয়েছে স্বর্ণ বা রুপার মূল্যের ভিত্তিতে। তা হলো—
সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণঅথবা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা।
বর্তমানে অধিকাংশ ফকিহ রুপার নেসাবকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ রুপার মূল্য তুলনামূলক কম।
তাই কারও কাছে যদি সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।
এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত—
- নগদ টাকা
- স্বর্ণ ও রুপা
- অলংকার
- ব্যবসায়িক পণ্য
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, বাড়ি, গাড়ি বা আসবাবপত্র
এ বছর কত টাকা থাকলে কুরবানি দিতে হবে?
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি ভরি রুপার দাম প্রায় ৩ হাজার ৫৬৮ টাকা। সে হিসাবে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার মূল্য দাঁড়ায় আনুমানিক ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ টাকা।
অর্থাৎ, কুরবানির দিনগুলোতে প্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ বাদ দেওয়ার পর যদি কারও কাছে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ টাকা বা সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।
তবে রুপার বাজারদর পরিবর্তনশীল হওয়ায় কুরবানির সময়কার বাজারমূল্য অনুযায়ী নেসাব হিসাব করা উচিত।
কুরবানি না করলে হাদিসে সতর্কবার্তা
যাদের কুরবানির সামর্থ্য আছে, অথচ তারা কুরবানি করেন না—তাদের ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কতা এসেছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
“যার কুরবানির সামর্থ্য আছে, তবুও সে কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।”
(মুসনাদে আহমদ: ৮২৭৩, ইবনে মাজাহ: ৩১২৩)
কুরবানির ফজিলত
কুরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ
“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির গোশত বা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
(সুরা আল-হাজ: ৩৭)
রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন—
مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ عَمَلًا أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ
“কুরবানির দিনে আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল আদম সন্তানের নেই।”
(তিরমিজি: ১৪৯৩)
কুরবানির মূল শিক্ষা
কুরবানি একজন মুমিনের ইমান, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি অবহেলা করা উচিত নয়। বরং নিজের সম্পদের সঠিক হিসাব করে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কুরবানি আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, কুরবানির আসল উদ্দেশ্য শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নিজের ভেতরের কৃপণতা ও দুনিয়াপ্রীতিকে ত্যাগ করা।





