১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রাক্কালে সংগঠিত প্রতিরোধে অটল ছাত্রসমাজ

Any Akter
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ১২:২৪ অপরাহ্ন, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৬:৪১ অপরাহ্ন, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব বাংলার আন্দোলন ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এসে নতুন গতি পায়, আর ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল সেই উত্তাল সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দিনটি ছিল প্রস্তুতি, কৌশল নির্ধারণ এবং প্রতিরোধকে সুসংগঠিত করার দিন- যেখানে ছাত্রসমাজ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছিল যে সামনে সংঘাতপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত অপেক্ষা করছে, তবুও পিছু হটার কোনো লক্ষণ ছিল না।

এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আবারও বৈঠকে বসে। বৈঠকে অংশ নেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ-এর নেতারা, যারা ২১ ফেব্রুয়ারির ঘোষিত ধর্মঘট, মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। প্রশাসন সম্ভাব্যভাবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে- এমন আশঙ্কা মাথায় রেখে কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। নেতারা ছাত্রদের সংগঠিত রাখা, দ্রুত বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক কর্মসূচি ঘোষণা করার কৌশল ঠিক করেন।

আরও পড়ুন: ভালোবাসার ইতিহাসে ১৪ ফেব্রুয়ারি: সেন্ট ভ্যালেন্টাইন থেকে বিশ্বজুড়ে উদযাপন

একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ জোরদার করা হয়। ছাত্রনেতারা ছোট ছোট বৈঠক, গোপন সমন্বয় এবং প্রচারণার মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নয়- কলেজ, স্কুল, এমনকি শ্রমজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানো হয়, যাতে আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের এই বিস্তারই ভাষা সংগ্রামকে একটি সর্বজনীন জাতীয় দাবিতে পরিণত করার ভিত্তি তৈরি করে।

এদিকে সরকারি মহলেও উদ্বেগ বাড়ছিল। প্রশাসন ক্যাম্পাস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি বাড়ায় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আন্দোলনের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছিল, ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং তা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। ফলে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল।

আরও পড়ুন: মুখোমুখি অবস্থানের আগে চূড়ান্ত প্রস্তুতি

১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল মূলত মানসিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দিন। ছাত্রসমাজ বুঝতে পারছিল সামনে বাধা আসবে, দমন-পীড়ন হতে পারে, তবুও ভাষার প্রশ্নে আপস না করার প্রত্যয় আরও শক্ত হয়ে ওঠে। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”- এই দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐক্য তখন আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই দিনটি তাই শুধু একটি প্রস্তুতির দিন নয়; বরং সংগঠিত প্রতিরোধের ভিত্তি সুদৃঢ় হওয়ার দিন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ প্রমাণ করে দেয়- যে আন্দোলনের ভিত জনসমর্থন, সংগঠন ও আদর্শে গড়া, তাকে দমন করা সহজ নয়; বরং সেই আন্দোলনই কয়েক দিনের মধ্যে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।