১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
চাপের মুখে প্রশাসন, চূড়ান্ত পর্বের দিকে ভাষা আন্দোলন
ঢাকা তখন আর শুধু আন্দোলনের শহর নয়, হয়ে উঠেছে অপেক্ষার শহর। ২১ ফেব্রুয়ারির আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। ১৯৫২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে সেই অপেক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ছাত্রসমাজ যখন প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার পথে, তখন প্রশাসনও স্পষ্টভাবে চাপ অনুভব করতে শুরু করে।
এই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সকাল থেকেই ছিল অস্বাভাবিক তৎপরতা। বিভিন্ন হলে ছাত্রদের আনাগোনা, ছোট ছোট দল করে আলোচনা, কোথাও ফিসফিসে বৈঠক- সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রনেতারা একাধিক দফা বৈঠকে বসেন, যেখানে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলনে ঐক্য জোরালো, প্রস্তুতি চূড়ান্তের পথে
১১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে প্রশাসনের সক্রিয়তা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি আগের দিনের তুলনায় আরও দৃশ্যমান ছিল। টহল জোরদার করা হয়, কিছু জায়গায় সন্দেহভাজনদের গতিবিধি লক্ষ্য করা যায়। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং নজরদারি বাড়ানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে, প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছাত্রসমাজ
তবে প্রশাসনের এই তৎপরতা ছাত্রসমাজের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারেনি। বরং তা আন্দোলনের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তোলে। ছাত্ররা মনে করতে শুরু করেন, আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে পিছু হটার আর কোনো সুযোগ নেই।
এই দিন আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানসিক সম্পৃক্ততা আরও গভীর হয়। অনেকেই ক্লাসের ফাঁকে কিংবা হলে ফিরে ভাষা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের দৃঢ় প্রত্যয় তৈরি হয়- ২১ ফেব্রুয়ারিতে রাজপথে উপস্থিত থাকতেই হবে।
১১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় আন্দোলনের ভাষা বদলাতে শুরু করে। শুধু স্লোগান নয়, আন্দোলনের কথাবার্তায় উঠে আসে আত্মত্যাগ, অধিকার আর পরিচয়ের প্রশ্ন। এই পরিবর্তন আন্দোলনকে আরও গভীর ও পরিণত করে তোলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১১ ফেব্রুয়ারি ছিল ভাষা আন্দোলনের মানসিক প্রস্তুতির দিন। বাহ্যিকভাবে বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও, এই দিনই আন্দোলনকারীরা বুঝে যান- সামনের দিনগুলো শান্ত থাকবে না।
ঢাকা শহর তখন নিঃশব্দ অপেক্ষায়। প্রশাসন প্রস্তুত, ছাত্রসমাজ প্রস্তুত। ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল তার অনিবার্য মোড়ের দিকে।
ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তাই ১১ ফেব্রুয়ারি স্মরণীয় হয়ে আছে- চূড়ান্ত পর্বের আগের চাপা উত্তেজনার দিন হিসেবে।##





