স্বরূপে ফিরছে সাদাপাথর

সংকট পেরিয়ে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে মেঘ-পাহাড়ের রাজ্য সাদাপাথর

Any Akter
জুলফিকার তাজুল, সিলেট
প্রকাশিত: ৬:০২ অপরাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৫ | আপডেট: ৬:০২ অপরাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভারত সীমান্তের কোলঘেঁষে, পাহাড় -মেঘ- নদীর প্রেমে মোড়া এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নাম সাদাপাথর। এই জায়গাটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি, যেখানে স্বচ্ছ জলের নিচে দেখা মেলে সাদা সাদা পাথরের মিতালি, আর চারপাশে সবুজ পাহাড় আর দিগন্তজোড়া নীল আকাশে ভাসমান মেঘ যেন তৈরি করে দেয় এক স্বপ্নিল অনুভব।

তবে সম্প্রতি এই স্বপ্নজাল ছিঁড়ে এসেছিল একটি দুঃসংবাদ—সাদা পাথরের লুটপাট। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, এবং স্থানটির নান্দনিকতা হারানোর আশঙ্কায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেকেই দুশ্চিন্তায় পড়েন। অনেকে ভেবেছিলেন, এতো নেতিবাচক ঘটনার পর পর্যটকেরা হয়তো আর আসবেন না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একদম ভিন্ন।

আরও পড়ুন: শেরপুরে শিক্ষার্থী মায়মুনা হত্যার রহস্য উদঘাটন, গ্রেপ্তার মূল আসামী আপন ফুফা

প্রকৃতি হারায়নি আকর্ষণ, পর্যটকের ভিড় এখনো অব্যাহত লুটের ঘটনা যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের ভালোবাসায় বাধা হতে পারেনি। হাজারো পর্যটক এখনো প্রতিদিন সাদা পাথরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসছেন। নৌকায় চড়ে ধলাই নদীর স্বচ্ছ পানিতে গা ভাসিয়ে, সাদা পাথরের ওপর হেঁটে বেড়িয়ে কিংবা পাহাড়ের কোলে বসে ছবির মতো দৃশ্য উপভোগ করে যাচ্ছেন। 

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক শেখ ওয়াসিফ ওয়াসাল প্রাপন জানান, “লুটপাটের খবর শুনে আমরা একটু শঙ্কিত ছিলাম, কিন্তু এখানে এসে দেখি, এখনো জায়গাটা দারুণ। প্রকৃতি এখনও আগের মতোই মোহনীয়। প্রশাসনও দেখছি অনেক সক্রিয়।”

আরও পড়ুন: গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ২০ জন


প্রশাসনের জোরালো ভূমিকা: 

ফিরিয়ে আনা হচ্ছে সাদা পাথরের জৌলুস সিলেট জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে লুট হওয়া পাথর পুনঃস্থাপনের কাজ। উদ্ধারকৃত পাথর ফের সাদা পাথরের মূল এলাকাতে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে, যেন প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে আসে। 

সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন, “আমরা এই এলাকা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একদিকে পর্যটন অব্যাহত রাখতে চাই, অন্যদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়, সেটাও নিশ্চিত করছি। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জনপ্রশাসন সচিবের বিশেষ নির্দেশনা

সাদা পাথরের গুরুত্ব অনুধাবন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো: মোখলেস উর রহমান জানান, সাদাপাথরসহ অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে বিশেষ প্যাকেজ কর্মসূচি নেওয়া হবে। পর্যটন নিরাপত্তা জোরদারে পুরো এলাকা থাকবে ২৪ ঘণ্টা সিসি ক্যামেরার আওতায়।

তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে পরিকল্পনা করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী পর্যটন ব্যবস্থাপনা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের লুটপাট ঠেকানো যায় এবং স্থানীয় জনগণও উপকৃত হন।

তিনি বলেন, “সাদা পাথর শুধু একটি প্রাকৃতিক স্থান নয়, এটি বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনার প্রতীক। আমরা একে রক্ষা করবো, উন্নত করবো, এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবো।”

স্থানীয়দের আশা ও নতুন সুযোগ

সাদা পাথর এলাকার অনেকেই সরাসরি পর্যটন নির্ভর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কেউ নৌকা চালান, কেউ খাবারের দোকান বা হোটেল চালান, কেউবা গাইড হিসেবে কাজ করেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এই নতুন উদ্যোগে আশাবাদী।

স্থানীয় নৌ-চালক সাইদুল ইসলাম বলেন, “কিছুদিন ব্যবসা কমে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আবার মানুষ আসছে। প্রশাসন খুব সচেষ্ট, তাই আমরা সাহস পাচ্ছি।”

একই কথা বললেন ব্যবসায়ী মোকাব্বির তিনি বলেন, “এত কিছুর পরও পর্যটকরা আসছেন, পর্যটকরা এখন নিরাপদ বোধ করছে। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকুক।”


ভবিষ্যতের দিগন্ত:

সাদা পাথর আজ শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ ও জনসম্পৃক্ত উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠছে। লুটের আঁধার কাটিয়ে প্রশাসনের তৎপরতা, সচিব পর্যায়ের নজরদারি, এবং স্থানীয়- পর্যটকদের অংশগ্রহণে এটি আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছে।

সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে, সাদা পাথর শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও নিজের জায়গা করে নিতে পারে।

জার্নালিস্ট ট্যুরিস্ট ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাদিকুর রহমান সাকী বলেন, “সাদা পাথর শুধু একটি পর্যটন স্থান নয়, এটি আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির এক অপূর্ব মিলনস্থল। এখানে লুটপাটের ঘটনা যেমন দুঃখজনক, ঠিক তেমনি প্রশাসনের দ্রুত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ আমাদের আশান্বিত করেছে।

আমরা পর্যটক হিসেবে শুধু জায়গাটি উপভোগ করতে আসি না, বরং এর টিকে থাকার জন্যও দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটকদের সমন্বয়েই সাদা পাথরকে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রশাসনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং পর্যটন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলতে চাই—আমরা সবসময় এমন উদ্যোগের পাশে থাকবো। সাদা পাথরের সৌন্দর্য যেমন অমূল্য, তেমনি এর সংরক্ষণও আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।”