জল আর সবুজে জেগে থাকা এক জলাবনের গল্প
রাতারগুল বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ গ্রামবাসী

সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোর দিকে চোখ জোড়ালে চোখে পড়ে এক দুঃখজনক মিল—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যতটা বিস্ময় জাগায়, তার চেয়েও বেশি বিষাদ জাগায় মানুষের লোভ, দুর্ব্যবস্থা আর অপরিকল্পিত দখলের চিহ্ন।
সাদাপাথর, জাফলং, বিছনাকান্দি, লালাখাল, শ্রীপুর, রাংপানি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া—এই সব নাম এখন শুধু সৌন্দর্যের নয়, পাথর লুট, নদী দখল আর নিঃশেষ প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্রোতের টানে পাথরের সঙ্গে বয়ে যাচ্ছে পাহাড়, নদী আর জীববৈচিত্র্য।
আরও পড়ুন: শেরপুরে শিক্ষার্থী মায়মুনা হত্যার রহস্য উদঘাটন, গ্রেপ্তার মূল আসামী আপন ফুফা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পূণ্যভূমি সিলেটের সবগুলো পর্যটনকেন্দ্রে কালো থাবা বসিয়েছিল দুষ্কৃতিকারীরা। সর্বদলীয় ‘ঐক্যমতে’ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় হরিলুট চালিয়েছে বালু ও পাথরখেকোরা। বালু-পাথর লুটের কারণে এসব পর্যটনকেন্দ্র যখন শ্রীহীন হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই এক আশার নাম হয়ে উঠেছে রাতারগুল—দেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন, যা এখনো রয়ে গেছে প্রায় অবিকৃত, একেবারে প্রাকৃতিক রূপে।
আর সেই রক্ষার কৃতিত্ব? কোনো প্রশাসনিক জাঁকজমক নয়, বরং প্রান্তিক গ্রামের সাধারণ মানুষের এক অসম্ভব মমতা আর সংকল্প।
আরও পড়ুন: গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ২০ জন
গেল মাসের ঘটনা। রাতারগুলের ভেতরে কয়েকজন বালুখেকো অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু করে। খবর পেয়ে গ্রামবাসীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বালু লুটকারীদের আটক করে বন কর্মকর্তাদের হাতে সোপর্দ করেন।
বালু ছাড়াও বন বাঁচাতে তারা বিষটোপ দিয়ে মাছ শিকার, গাছ কাটা, পাখি শিকার এবং শুকনো মৌসুমে আগুন থেকে বন রক্ষা করা—এখন রাতারগুল গ্রামবাসীদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে রাতারগুলের গ্রামবাসীর প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার এমন মহান উদ্যোগের ফল এখন নগদে পাচ্ছেন। জাফলং, বিছনাকান্দি, সাদাপাথরসহ অন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যখন পর্যটক বিমুখ, তখন রাতারগুলে ভিড় করছেন পর্যটকেরা। সরেজমিন গতকাল রবিবার হাজারো পর্যটককে নৌকা দিয়ে বনের ভেতরে ঘুরতে দেখা গেছে।
বছরের পর বছর ধরে রাতারগুল মুগ্ধ করে আসছে প্রকৃতিপ্রেমীদের। কিন্তু যখন পর্যটনের চাপ বেড়ে যাচ্ছে, তখনই স্থানীয় মানুষ নিজেরাই দাঁড়িয়েছেন বন রক্ষার ফ্রন্টলাইনে।
২০১৪ সালে সরকার রাতারগুলকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করে। এরপর বন বিভাগের কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। তবে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছে এক ভিন্ন মডেল।
নিয়ম মানা বন, নয়তো প্রবেশ নয়
পর্যটকদের জন্য এখন সুনির্দিষ্ট নৌপথ নির্ধারণের দাবি উঠেছে। বেশি নৌকা যেন না চলে, গাইডরা যেন প্রশিক্ষিত হন—এই চাহিদা রেখেছেন গ্রামবাসীরা নিজেরাই। তারা গঠন করেছেন বন রক্ষা কমিটি। নিজেরাই পাহারা দেন, কাউকে প্লাস্টিক ফেলতে দেখলে সাবধান করেন, অনুরোধ করেন শব্দ কমাতে।
রাতারগুলের প্রাণ-প্রকৃতির বন্ধু স্থানীয় পরিবেশকর্মী সোনা মিয়া বলেন, "আমরা নিজেরাই এখন পাহারা দিচ্ছি, কারা প্লাস্টিক ফেলে, কারা শব্দ করে—বলছি তাদের, বুঝাচ্ছি। এটা শুধু বন না, এটা আমাদের ভবিষ্যতের আশা।"
স্থানীয় বাসিন্দা নৌকার মাঝি ইমান উদ্দিন বলেন, "এই বন আছে বলেই মানুষ আসে। আমরা চাই, বনটাও বাঁচুক, আমরাও উপকার পাই। কিন্তু সেটা নিয়ম মেনে হলে সবারই ভালো।"
রাতারগুল একদিকে যখন বিছনাকান্দি কিংবা সাদাপাথরে ট্রাক ট্রাক পাথর ওঠে-নামে, জাফলংয়ের নদীস্রোত দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে অবৈধ বালু উত্তোলনে, তখন রাতারগুলে নেই সেই লোভের ছায়া। নেই দখলের সংঘর্ষ, কিংবা পর্যটন ব্যবসার দৌড়ঝাঁপ।
রাতারগুল এক ব্যতিক্রম। কারণ এখানে মানুষ বনকে দেখে ভোগের বস্তু হিসেবে নয়, বরং ভালোবাসার বস্তু হিসেবে। এখানে "ব্যবসা" নয়, এখানে "সম্মান"—এই বোধটাই রক্ষা করছে বন।
শেষ কথা
রাতারগুলের মডেল কি হতে পারে ভবিষ্যতের পথ? গ্রামবাসী, বন বিভাগ ও পর্যটকদের মধ্যে সমন্বয় হলে কেবল রাতারগুল নয়, সিলেটের অন্য এলাকাগুলোকেও রক্ষা করা সম্ভব। রাতারগুলের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে—চাইলেই পরিবেশ ও পর্যটন একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে, যদি থাকে সচেতনতা আর সদিচ্ছা।
এই বন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি মানসিকতার নাম—যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদকে লুটে নয়, ভালোবেসে রক্ষা করা হয়।