ঢাকা ৪ ও ৫ আসনে কর্মী সমর্থকদের চরম ক্ষোভ
আসন আলাদা হলেও ৩৫ বছরের বিরোধে বিএনপির দুজনেই হারলেন
রাজধানী ঢাকার দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ বেষ্টিত জাতীয় সংসদের ঢাকা ৪ ও ৫ আসন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বিএনপির কর্মী সমর্থকদের প্রভাবিত এলাকা। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশপথ ঢাকা ৪ ও পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম-সিলেট অঞ্চলের একমাত্র প্রবেশপথ হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এটি। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই নেতার পারিবারিক বিরোধে দীর্ঘদিনের বলি হলেন দুইজনেই। বিএনপির এই দুই নেতার বিরুদ্ধে সুযোগ নিয়েছে জামায়াত ইসলামী। দুটি আসনেই অল্প ভোটে জামায়াত ইসলামী বিজয়ী হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি কর্মী সমর্থকদের আহাজারি মূলক অভিযোগ, দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর ধরে দুই পরিবারের বিরুদ্ধে এই এলাকার বিএনপি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৯১ সালে ডেমরা এলাকা থেকে নির্বাচিত হন বিএনপির সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এলাকার ডেমরা থানার সভাপতি ছিলেন নবীউল্লা নবী। তখন থেকেই এলাকার আধিপত্য নিয়ে পারিবারিক রাজনৈতিক বিরোধ জড়িয়ে পড়ে সালাউদ্দিন ও নবীউল্লা নবীর মধ্যে। প্রায় প্রতিদিনই বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি চলতে থাকে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানালেন মির্জা ফখরুল
২ দশক ধরে আসন ভেঙে ঢাকা চার ও পাঁচ হলেও তাদের বিরোধ শেষ হয়নি। এলাকার বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী জানালেন, আসন আলাদা হলেও এবারের নির্বাচনে পুরো সময়টিতে এই দুই পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রার্থীদের মধ্যে চলছিল চরম বিরোধ। মূলত এক সময়েই আসনটি সালাউদ্দিন আহমেদের বাড়ি ও পারিবারিক সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরবর্তীতে তিনি শ্যামপুর এলাকায় নির্বাচিত হন। কিন্তু এলাকায় আলাদা হলেও সালাউদ্দিন ডেমরা এলাকার প্রভাব ছাড়তে চাননি।
নবীউল্লা নবী ডেমরা, সায়দাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় নির্বাচন করলেও এই এলাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় তার প্রভাব বাড়াতে থাকে। মূলত ৫ আগস্ট পরবর্তী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও লাভজনক বিরোধকে ঘিরেই দুই পরিবারের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। আসন আলাদা হলেও এই দুই বিএনপির প্রার্থী একে অপরকে পরাজিত করতে সমর্থকদের এমনকি অর্থনৈতিকভাবেও শক্তি প্রয়োগ করেছেন।
আরও পড়ুন: ঢাকা ১১ আসনে গেজেট স্থগিত করে ভোট পুনঃগণনার দাবি ড. এম এ কাইয়ুমের
বিষয়টি নিয়ে কর্মী সমর্থকরা সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক টিমকে জানালেও কোনো কর্ণপাত হয়নি। বিএনপি'র ঢাকা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেও সফলতা আনতে পারেননি। দুই ব্যক্তির দীর্ঘদিনের আধিপত্যের প্রভাবকে ঘিরে চরম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীরা। অবশেষে অল্প ভোটে জামায়াত ইসলামের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়ায় দুইজনেই একই অবস্থায় পড়েছেন।
কর্মী সমর্থকদের দাবি, এই দুই পরিবারের পথ থেকে বিএনপিকে মুক্ত করা এবং কেন্দ্র নেতৃবৃন্দের তত্ত্বাবধানে ঢাকা চার ও পাঁচ আসনের নেতৃত্ব পুনর্গঠন করা।
ঢাকা ৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলে তানভীর আহমেদ ৭৪৪৪৭ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এ আসনে বিজয়ী হন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী প্রার্থী সৈয়দ জয়নাল আবেদীন, যার প্রাপ্ত ভোট ৭৭৩৮৭। এছাড়া মিজানুর রহমান নামে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রায় ১০ হাজার ভোট পেয়েছেন। অভিযোগ আছে এই স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনের পেছনে পার্শ্ববর্তী নবীউল্লা নবীর ইন্ধন রয়েছে।
ঢাকা-৫ আসনের বেসরকারি প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন ৯ হাজার ১৫০ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে মোহাম্মদ কামাল হোসেন (দাঁড়িপাল্লা) প্রতীকে পেয়েছেন ৯৬,৬৪১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মো. নবীউল্লা ৮৭,৪৯১ ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচনে বড় দুই দল ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. ইবরাহীম (হাতপাখা) পেয়েছেন ১৪,২০৬ ভোট। জাতীয় পার্টির প্রার্থী মীর আব্দুস সবুর (লাঙ্গল) পেয়েছেন ১,৩৪৬ ভোট। লিবারেল ডেমোক্রাটিক পার্টির প্রার্থী মো. হুমায়ুন কবির (ছাতা) পেয়েছেন ৭৮৮ ভোট। বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী মো. সাইফুল আলম (ডাব) পেয়েছেন ২৬২ ভোট। এছাড়া বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী শাহিনুর আক্তার সুমি (কাঁচি) পেয়েছেন ২২১ ভোট, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী তোফাজ্জল হোসেন মোস্তফা (কাস্তে) পেয়েছেন ২০৬ ভোট, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম (ট্রাক) পেয়েছেন ৯৩ ভোট। বাংলাদেশ লেবার পার্টির প্রার্থী মো. গোলাম আজম (আনারস) পেয়েছেন ৮১ ভোট, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী মো. তাইফুর রহমান রাহী (ছড়ি) পেয়েছেন ৩৫ ভোট।
ঢাকা-৫ আসনে মোট ভোটার ৪,১৯,৯৯৬। এর মধ্যে ২,০৪,৭৫০ জন ভোট দিয়েছেন। ভোট গ্রহণের হার ৪৮.৭৫ শতাংশ। মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ২,০১,৩৭০ এবং বাতিলকৃত ভোটের সংখ্যা ৩,৩৮০।





