গাজীপুর -৩

৪৭ বছরের দেয়াল ভেঙ্গে শ্রীপুরের সন্তানের সংসদযাত্রা

Sanchoy Biswas
বশির আহমেদ কাজল, গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:১২ অপরাহ্ন, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৮:১৬ অপরাহ্ন, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজনীতির ইতিহাসে কিছু দিন থাকে, যেগুলো কেবল ফলাফলের দিন নয়, হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা বহু বছরের বঞ্চনার জবাব। গাজীপুর-৩ সাংসদীয় আসনের জন্য এবারের নির্বাচন তেমনই এক দিন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু ৬১ হাজার ৯০৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম শ্রীপুরের মাটি থেকে উঠে আসা কোনো প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকে সংসদে যাচ্ছেন। শুধু একটি আসন নয়, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অপেক্ষার অবসান ঘটল এ বিজয়ে।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত যখন ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল, তখনও শেষ হয়নি মানুষের অপেক্ষা। উপজেলা সভা কক্ষের বাইরে অপেক্ষমান হাজারো মানুষ, চা-খানা কিংবা পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে বসে—সবারই যেন এক অনুচ্চারিত প্রশ্ন বুকে ছিল—‘এবার কি তবে আমাদেরই একজন? আমাদের মাটিতে জন্ম নেওয়া সন্তানই কি যাচ্ছে সংসদে?’

আরও পড়ুন: ফুলের দোকানে উপচে পড়া ভিড়, বিনোদন কেন্দ্রের নয়া লুক

শ্রীপুর উপজেলার একটি পৌরসভা, ৮টি ইউনিয়ন ও গাজীপুর সদরের ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৩ আসনটি বহু বছর ধরেই প্রত্যাশার প্রতীক। অতীতে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন, কিন্তু তারা ছিলেন বাইরের। স্থানীয় কর্মীরা কাজ করেছেন, ঘাম ঝরিয়েছেন, মিছিল টেনেছেন, কিন্তু প্রতিনিধিত্ব ছিল অন্যের হাতে। সেই অসম্পূর্ণতার ক্ষত ছিল নীরব, কিন্তু গভীর।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এবার মনোনয়ন দেয় শ্রীপুরের টেপিরবাড়ি গ্রামের সন্তান অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চুকে। দলের চরম দুর্দিনে রাজপথ কাঁপানো এই চিকিৎসক ও রাজনীতিককে মনোনয়ন দিয়ে দলটি ভুল করেনি, সেটা প্রমাণ হয়েছে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। শুরুতে দলে আটজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও বাচ্চুর নাম ঘোষণার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। প্রকাশ্য বিরোধিতার জায়গায় আসে ঐক্যের বার্তা। স্থানীয়দের ভাষায়, “এবার লড়াই ছিল নিজেদের মানুষকে জেতানোর।”

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরের ৪টি আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থীরা

সাতজন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বীতায় শেষ পর্যন্ত ব্যবধান স্পষ্ট। ক্লিন ইমেজের ডা. বাচ্চুকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই সংসদীয় এলাকার হাট বাজার, চায়ের দোকান, গ্রামের উঠান—সবখানে ছিল এক ধরনের সংযত উচ্ছ্বাস; যেন মানুষ গভীর স্বরে বলছে—‘অবশেষে’।

ডা. বাচ্চুর রাজনৈতিক জীবন চার দশকেরও বেশি দীর্ঘ। ১৯৮১ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদল দিয়ে শুরু। ছাত্রনেতা থেকে পেশাজীবী সংগঠনের দায়িত্ব, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকা—সব মিলিয়ে তার পথ সহজ ছিল না।

আওয়ামী লীগের দুঃসাশনের সময় প্রতিহিংসায় পিজি হাসপাতাল থেকে চাকরিচুক্ত হওয়া, গ্রেপ্তার, মামলা, দীর্ঘদিন কারাবাস—এসবও তাঁর জীবনের অধ্যায়। কিন্তু পরিচয়ের আরেকটি দিকও আছে—চিকিৎসক হিসেবে মানবিক উপস্থিতি। করোনাকালে ব্যক্তিগত সহায়তা, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব স্মৃতি ভোটারদের মনে রেখাপাত করেছে।

বিজয়ের পর অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, “আজ আমার চোখে জল, হৃদয়ে শুধু কৃতজ্ঞতার ঢেউ। এই বিজয় কোনো পদ-পদবীর নয়, এটি আমাদের স্বপ্নের বিজয়, আমাদের বিশ্বাসের বিজয়। এ অঞ্চলের মানুষের প্রতিটি ভালোবাসা আজ আমার কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভোট কেবল একটি চিহ্ন নয়, এটি ছিল আমার ওপর মানুষের আস্থা, আশা, চোখের স্বপ্ন। আমি চির কৃতজ্ঞ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির কাছে। আমার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে আমাকে এ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমার প্রতি দলের আস্থা ও বিশ্বাস এবং মানুষের সেই স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেবো না। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে মানুষের কল্যাণের জন্য।”

স্থানীয়রা বলছেন, এই ফলাফল গাজীপুর-৩ এর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার শ্রীপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক লড়াকুর সংসদে যাত্রা—এ শুধু সাংগঠনিক সাফল্য নয়, আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার।

এখন প্রশ্ন একটাই—এই আস্থা কতটা বাস্তবতায় রূপ পায়। কারণ বিজয় ইতিহাস লেখে, কিন্তু প্রতিশ্রুতি ইতিহাসকে স্থায়ী করে। অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু শুধু ইতিহাস লিখতে চান না, ইতিহাসকে স্থায়ীও করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, গাজীপুর-৩ সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু প্রায় ৬১ হাজার ৯০৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি ১ লাখ ৬১ হাজার ২৫৮ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত জোটের (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) প্রার্থী মাওলানা এহসানুল হক পেয়েছেন ৯৯ হাজার ৩৫৪ ভোট।