বাউফলে মা ইলিশ রক্ষার অভিযানে নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ
প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণে ইলিশ অভয়াশ্রমকেন্দ্রে তেঁতুলিয়া নদীতে সকল ধরনের মাছ শিকারে ২২দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। নিষেধাজ্ঞা সফল করতে নদীজুড়ে দিনরাত টহল দিচ্ছে নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ। কিন্তু নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই নৌ পুলিশের একটি অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। মা ইলিশ সংরক্ষণের অভিযান পরিচালনার আড়লে টাকার বিনিময়ে জেলেদের অবাধে ইলিশ ধরার সুযোগ প্রদান, আটককৃত জেলেদের অধিকাংশই ছেড়ে দেওয়া, জব্দকৃত জাল ও মাছ গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন, বাতিরখাল, চরওয়াঢেল খানকা, চরকলাইয়া ও চর শৌলা পয়েন্ট গত কয়েক দিন ধরে চালানো অনুসন্ধানে কালাইয় নৌ পুলিশ ফাঁড়ির একটি অসাধু চক্রের এসব অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।
আরও পড়ুন: আগামী ১০ বছরেরও শেখ হাসিনা ফেরার সম্ভবনা নেই : ভোলায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন
নৌ পুলিশের পাহারায় ইলিশ নিধন
গত ৮ অক্টোবর তেঁতুলিয়া নদী মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। যা চলবে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফল করতে নদীতে নিয়মিত টহলে নামে নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ। যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করার কথা থাকলেও এককভাবে অভিযান পরিচালনা করছেন কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার।
আরও পড়ুন: সালাউদ্দিন আহমেদের রুহের মাগফিরাত কামনায় কুলখানি
অভিযানের শুরু থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে একশ্রেণির অসাধু জেলেদের নদীতে অবাধে মাছ শিকারের সুযোগ প্রদান করে দেওয়ার অভিযোগ উঠে নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে। নিষেধাজ্ঞার ১২তম দিনে (১৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন পয়েন্টে ছদ্মবেশে অবস্থান করলে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল সাড়ে ৪টার পর থেকে নৌ পুলিশের অভিযানের ট্রলারটি ফেডারেশন ও দক্ষিণ চরওয়াঢেলের মাঝমাঝি জায়গায় তেঁতুলিয়া নদীতে অবস্থান করছিল। দুই ঘন্টারও বেশি সময় একই জায়গায় নোঙর করে রাখা হয়। সাথে ছিল দ্রুতগতির স্পীড বোট। ট্রলারের নৌ পুলিশের সদস্য ও ট্রলারের চালকসহ বেশ কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। তখন ওই ট্রলার ৫০০ মিটারের মধ্যে একাধিক জেলে ট্রলার থেকে নদীতে জাল ফেলা হয়। অনেক ট্রলার মাছ শিকার করে নৌ পুলিশের টহলরত ট্রলার পাশ দিয়ে চলে যেতেও দেখা যায়। দেখে মনে হচ্ছে - নৌ পুলিশের পাহারায় অবাধে ইলিশ নিধনের মহোৎসব চলছে।
স্থানীয় জেলে ও নদী পাড়ের বাসিন্দারা জানান,‘নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন কিছু অসাধু নৌ পুলিশ সদস্য জেলেদের সাথে গোপনে চুক্তি করেন। ট্রলার প্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় নদীতে জাল ফেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। চুক্তিবদ্ধ জেলেরা নিরাপদে নদী ধাপিয়ে বেড়ায়। নৌ পুলিশের নদীতে অভিযানে নামার আগেই খবর তাদের কাছে চলে যায়, তখন তারা নিরাপদে সরে যায়।’
অনুসন্ধান বলছে, চরব্যারেট, বাতির খাল, খানকা, দ্বেবীরচর, চরকলাইয়া ও বগী তুলাতলায় এলাকার প্রায় অর্ধশত ট্রলারের জেলেদের সাথে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় নৌ পুলিশের চুক্তি হয়। কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামন, এএসআই কবির হোসেন, নৌ পুলিশের ট্রলারের চালক জালাল গাজী ও কয়েকজন আড়তদারের মাধ্যমে হয় এসব চুক্তি করেন জেলেরা।
এ বিষয়ে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ মনিরুজ্জামান তালুকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি চুক্তিতে মাছ ধরার সুযোগ প্রদানের কথা অস্বীকার করেন। তবে নৌ পুলিশের টহলের পাশে অবাধে মাছ ধরার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ অনেক অসচ্ছল মানুষ নদীতে জাল ফেলে, তাই মানবিক কারণে তাদের ধরা হয় না।’
টাকায় মিলে মুক্তি, গোপনে চলে মাছ জাল বিক্রি
কালাইয়া নৌ পুলিশের দেওয়া তথ্য বলছে, অভিযান শুরু থেকে ২১ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের দায়ে ৪৪জন জেলেকে আটক করা হয়। পরে তাদের ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ১১টি নিয়মিত মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। এছাড়াও বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও মাছ জব্দ করা হয়। এসব জাল পুড়িয়ে ধ্বংস এবং মাছ এতিম খানায় বিতরণ করা হয়। অভিযানের ৮, ১৩, ১৪,১৫, ১৭ ও ২০ অক্টোবর কোনো জেলে আটক সম্ভব হয়নি। নৌ পুলিশের দাবি মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফল করতে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূন্ন উল্টো। অভিযানে আটক অধিকাংশ জেলেদের অর্থ বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া এবং জব্দকৃত মাছ ও জাল গোপনে বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্টেট বা মৎস্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতার নেতৃত্বে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান পরিচালনা করার কথা থাকলে এককভাবে নদীতে অভিযানে নামে নৌ পুলিশ। অভিযানে গিয়ে যে সব জেলে জাল ও ট্রলার সহ আটক করা হয় তাদের নিয়ে মাঝ নদীতে বসে মুক্তি বিনিময় আলোচনা। ৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় জেলেদের মুক্তি, জব্দ জাল দেড় হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বিক্রি ও জব্দ মাছ ৪শ থেকে ৬ হাজার টাকা হালিতে বিক্রি করা হয়। নৌ পুলিশের মনিরুজ্জামন, কবির, ট্রলার চালক জালাল গাজী ও তার ভাই ফিরোজ গাজীর মাধ্যমে হয় রফাদফা। নগদ টাকা না দিলে জালাল গাজী ও ফিরোজ গাজীর মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। গত কয়েক দিনে লাখ লাখ টাকার বানিজ্য করেছেন নৌ পুলিশ।
গত ১৬ (শুক্রবার) সকালে নিষেধাজ্ঞার মধ্য নদীতে জাল ফেলতে গিয়ে আটক হয় চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের জেলে নুর আলম। ফিরোজ গাজীর মাধ্যমে নৌ পুলিশকে ১০ হাজার টাকায় দিয়ে মুক্তি পান তিনি। গত ১৮ অক্টোবর (রোববার) ভোরে তেঁতুলিয়া নদীর চর দিয়ারা এলাকা থেকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের দায়ে ৪টি ট্রলার সহ কয়েকজন জেলেদের আটক করে নৌ পুলিশ। ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
টাকার বিনিময়ে মুক্তি পাওয়া জেলেদের মধ্যে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের রাকিব (ছদ্মনাম) একজন। তার ভাষ্যমতে, তাকেসহ চারটি ছোট ইঞ্চিনের ট্রলার আটক করে নৌ পুলিশ। পরে ট্রলার প্রতি ৫ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার হাজার টাকায় ছেড়ে দেওয়ার রফাদফা হয়। তাদের সাথে নগদ টাকা না থাকায় নৌ পুলিশের ট্রলার চালাক জালাল গাজীর ভাই যুবদল নেতা ফিরোজ গাজীর জিম্মায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তি পাওয়া জেলেরা পরে ওই টাকা পরিশোধ করেন।
একই দিনে চর দিয়ারার জেলে শাহিন, হারুন গাজী সহ তিনজনকে মাছ শিকারের দায়ে জাল সহ আটক করে। হারুন গাজীসহ দুজনকে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। নৌ পুলিশের ট্রলারের চালক জালাল গাজী মাধ্যমে নেওয়া হয় এ টাকা। তবে আটক শাহিনকে মৎস্য সংরক্ষণে আইনের মামলায় আদালতে প্রেরণ করা হয়।
শাহিনের অভিযোগ, তার মুক্তির জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেন নৌ পুলিশের এএসআই কবির হোসেন। দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় মামলা দিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। তার জব্দকৃত জাল ভোলার লালমোহনের নাজিম নামে এক ব্যক্তির কাছে ২৫ হাজার টাকা বিক্রি করা হয় বলে দাবি করেন শাহিন।
এদিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকারের অপরাধে আরও চারজন জেলে আটক করা হয়। ১০ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পান তারা।
১৯ অক্টোবর (সোমবার) চর ফেডারেশনের খাল থেকে এক জেলে মাছ শিকারে নামলে তার ট্রলার জব্দ করে নৌ পুলিশ। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তি নৌ পুলিশের ট্রলারের মাঝি জালাল গাজীর মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা দিয়ে নৌকা ছাড়িয়ে আনেন।
২০ অক্টোবর (বুধবার) সকাল ৭টর দিকে তেঁতুলিয়া নদীর দক্ষিণ চরওয়াঢেল খানকা বাজারের পূর্ব -দক্ষিণ থেকে চর রায়সাহেব এলাকা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০জন জেলের জাল জব্দ করে নৌ পুলিশ। জব্দকৃত জাল নিয়ে নদীতেই অবস্থান করেন নৌ পুলিশ। এসময় টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে নিতে জেলেরা দফায় দফায় নৌ পুলিশের ট্রলারের চালকের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। এক পর্যায় চরওয়াঢেলের জেলে শহিদুল ও সুজন ট্রলার নিয়ে নৌ পুলিশের ট্রলারের গিয়ে ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে জাল ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। জাল নিয়ে আসার পর স্থানীয় আরেক জেলে নুর জামাল অভিযোগ করেন শাহিদুল টাকা দিয়ে তার জাল নিয়ে এসেছেন। এনিয়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
পূর্ব কালাইয়া গ্রামের বাসিন্দা সোহাগ বলেন,‘ গত রোববার ভোরে নদীতে জাল ফেলে চর ফেডারেশনে লুকিয়ে থাকেন। পরে নৌ পুলিশ তার জাল জব্দ করে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের কালা রাশেদ নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চর কালাইয়া গ্রামের এক জেলে বলেন, শনিবার নদীতে জাল ফেলে চরে অপেক্ষা করছিলাম। তখন চরফেডারেশনের কাছাকাছি নৌ পুলিশ ট্রলার থামিয়ে বসে ছিলেন। আমার জাল ভেসে নৌ পুলিশের ট্রলার কাছে চলে যায়। তখন তারা আমার জাল টেনে ট্রলারে তুলেন। পরে নৌ পুলিশের দারোগা কামালকে ফোন করি। ১৫শ টাকার বিনিময়ে আমার জাল ফেরত দিয়ে দেয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অভিযানে জব্দ জাল ও মাছ জালাল গাজীর কাছে রাখা হয়। তিনি জাল ও মাছ বিক্রি করে টাকা নৌ পুলিশের কাছে পৌঁছে দেয়। বিনিময়ে তাকে কমিশন দেওয়া হয়।
তবে টাকার বিনিময়ে আটককৃত জেলে ও তাদের জাল - নৌকা ছেড়ে দেওয়া, গোপনে জাল ও মাছ বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করছেন অভিযুক্ত নৌ পুলিশের এএসআই কবির হোসেন ও দায়িত্ব প্রাপ্ত ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার। তাদের দাবি, এসব অভিযোগ মিথ্যা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল অঞ্চল নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার এসএম নাজমুল হক বলেন,‘ সুনিদিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এম.এম পারভেজ বলেন,‘ নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করার কথা। তবে নৌ পুলিশ পৃথকভাবে অভিযান পরিচালনা করছেন, এতে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি আমাদের উধতন কর্মপক্ষকে অবহিত করব।





