হুমায়ুন আজাদ ও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়

Sanchoy Biswas
বাহাউদ্দিন গোলাপ
প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ন, ১২ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৬:৩৪ অপরাহ্ন, ১২ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

২০০৪ সালের ১২ আগস্ট জার্মানির মিউনিখ শহরের এক নিস্তব্ধ ঘরে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও প্রথাভাঙা লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের হৃদস্পন্দন। তিনি কেবল একজন কবি, ঔপন্যাসিক বা প্রাবন্ধিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার এক দুর্ভেদ্য প্রতীক। সমাজ ও চিন্তার শতাব্দীপ্রাচীন অচলায়তন গুঁড়িয়ে দিতে তিনি নিজের কলমকে বানিয়েছিলেন এক শাণিত অস্ত্র।

স্বাধীন চিন্তার এই আপসহীন রূপকারের জীবনসংগ্রাম শুরু হয়েছিল বিক্রমপুরের পলিমাটিতে। ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জের রাঢ়িখাল গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম, যেখানে শৈশবে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল হুমায়ুন কবীর। রাঢ়িখালের ঐতিহাসিক স্যার জে. সি. বসু ইনস্টিটিউশন থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ শেষে তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে এবং পরবর্তীতে পৌঁছান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৬৭ সালে স্নাতক ও ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি নিজের অসাধারণ অ্যাকাডেমিক মেধার স্বাক্ষর রাখেন।

আরও পড়ুন: ভারত মহাসাগরের নতুন করিডর: ভূরাজনীতির কেন্দ্রে বাংলাদেশ

সাহিত্যের আঙ্গিনায় নিজের স্বকীয় পরিচয় ফুটিয়ে তুলতে তিনি 'হুমায়ুন আজাদ' নামটি গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া ও সরকারি গেজেটের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নামটির স্থায়ী রূপ দেন। এরপর ভাষাবিজ্ঞানের প্রথাগত ব্যাকরণকে আধুনিক বাক্যতত্ত্বের আলোয় রূপান্তর করতে তিনি পাড়ি জমান স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ১৯৭৬ সালে "Pronominalization in Bengali: Generative-Transformational Study" শীর্ষক গবেষণার জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন, যা নোয়াম চমস্কির রূপান্তরমূলক বাক্যতত্ত্বের ধারায় বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাসে আজও এক মৌলিক কাজ হিসেবে স্বীকৃত।

মেধার এই উজ্জ্বল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সাথে নিয়ে দেশে ফিরে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন পঠন-পাঠন ও মননশীল গবেষণায়। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু করে পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ সালে তিনি পূর্ণ অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। অ্যাকাডেমিক গবেষণার গুরুগম্ভীর কাজের পাশাপাশি তরুণদের যুক্তিবাদী মনন গড়ে তুলতে তিনি লেখেন 'লাল নীল দীপাবলি' (১৯৭৬) এবং 'কত নদী সরোবর' (১৯৮৭)-এর মতো গ্রন্থ, যা সাহিত্য ও ভাষার জটিল ইতিহাসকে অত্যন্ত সহজ রূপ দেয়।

আরও পড়ুন: মরণফাঁদ অটোরিকশা এখনই কঠোর নিয়ন্ত্রণ চাই

কিন্তু শিক্ষক ও গবেষকের গণ্ডিতেই তিনি নিজেকে আটকে রাখেননি; তাঁর ভেতরে বাস করত এক চিরবিদ্রোহী কবিসত্তা। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অলৌকিক ইস্টিমার'-এর কবিতাগুলো সমকালীন প্রথাগত কাব্যভাষাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। পরবর্তীতে 'জ্বলো চিতাবাঘ', 'সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে' কিংবা 'একটি খাকি কলম'-এর মতো কাব্যগ্রন্থগুলোতে দ্রোহ ও আধুনিক নান্দনিকতা একই ধারায় মিশে গিয়েছিল।

কবিতার প্রাঙ্গণ থেকে গদ্য ও দর্শনে পদার্পণ করতেই বিশ্বসাহিত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রে ফুটে ওঠে তাঁর প্রকৃত রূপ। সেখানে তিনি দাঁড়ান সেইসব প্রখর চিন্তকদের সারিতে, যাঁরা যুগে যুগে ক্ষমতার অন্ধত্ব ও সামাজিক সংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে লড়াই করেছেন। ইউরোপীয় নবজাগরণের ভোরে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার যেমন তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ দিয়ে প্রথাগত অন্ধত্বকে আঘাত করেছিলেন, কিংবা সার্ত্র ও কামু যেমন ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন—হুমায়ুন আজাদও ঠিক সেভাবেই বাংলা সাহিত্যে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন উগ্র মৌলবাদ, ভণ্ডামি ও সামন্তবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে।

চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বখ্যাত চিন্তক এডওয়ার্ড সাঈদের মতো বিশ্বাস করতেন—বুদ্ধিজীবীর মূল কাজই হলো ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত অস্বস্তিকর সত্য বলে যাওয়া। এই প্রথাগ্রাসহীন মুক্তভাবনার সবচেয়ে বৈপ্লবিক প্রকাশ ঘটে ১৯৯২ সালে, তাঁর বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ 'নারী' প্রকাশের মাধ্যমে। ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার যেমন তাঁর 'দ্য সেকেন্ড সেক্স' গ্রন্থে পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, আজাদও তেমনই ইতিহাস, ধর্ম ও মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে বাংলা ভাষায় প্রথাগত নারীবাদী চর্চার নতুন দুয়ার উন্মুক্ত করেন।

তাঁর এই দুঃসাহসী উচ্চারণ স্বাভাবিকভাবেই প্রথাগত সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর এক প্রশাসনিক আদেশে বইটি বাজেয়াপ্ত করে। কিন্তু আজাদের অদম্য আইনি লড়াইয়ের পর ২০০০ সালে মহামান্য হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞাকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন। আইনি বিজয়ের এই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস 'ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল'-এ সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি 'যাদুকরের মৃত্যু' কিংবা 'রাজনীতিবিদগণ'-এর মতো উপন্যাসে তিনি সমাজ ও রাজনীতির মেকি চেহারা খুলে ধরেন, যা চেক লেখক মিলান কুন্দেরার উপন্যাসে রাষ্ট্রীয় মিথ্যার ব্যবচ্ছেদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

রচনার এই আপসহীন ধারা জীবনের শেষ দিনগুলোতে পৌঁছালে আরও বেশি প্রখর হয়ে ওঠে। ২০০৩ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর বহুচর্চিত উপন্যাস 'পাক সার জমিন সাদ বাদ', যেখানে ধর্মভিত্তিক উগ্র মৌলবাদের পৈশাচিক রূপ ফুটিয়ে তোলেন। এই স্পষ্ট উচ্চারণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে উগ্রপন্থী ঘাতকচক্রের সন্ত্রাসী হামলায় তিনি মারাত্মক আহত হন।

অলৌকিকভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও সেই আঘাতের শারীরিক যাতনা তিনি বহন করেছিলেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। সুদীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির চার সদস্যের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মাধ্যমে এই পৈশাচিক হামলার বিচারিক নিষ্পত্তি করেন। তবে সেই শারীরিক ক্ষত নিয়েই ২০০৪ সালের আগস্টে কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণার উদ্দেশ্যে জার্মানি পাড়ি জমিয়েছিলেন এই বীর সেনানী, আর সেখানেই নিঃসঙ্গ প্রবাসে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান তিনি।

বর্তমান সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে ছদ্মবেশে মুক্তচিন্তার ওপর আক্রমণ বাড়ছে এবং অন্ধসংস্কারের প্রচ্ছায়ায় সত্য ঢাকা পড়ছে, তখন হুমায়ুন আজাদের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব নিয়ে সামনে আসে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে শৃঙ্খল কেবল হাতে-পায়ে থাকে না, শৃঙ্খল থাকে মানুষের মগজেও—আর সেই মগজের শৃঙ্খল ভাঙার একমাত্র উপায় হলো প্রশ্ন করা ও সত্যকে মুখোমুখি দাঁড় করানো।

হুমায়ুন আজাদ আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে অনুপস্থিত ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্য, ভাষাতাত্ত্বিক প্রজ্ঞা, প্রমিত ব্যাকরণিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রথা ভাঙার সাহসী উচ্চারণ আজও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং প্রথাকে প্রশ্ন করার অবিচল সাহস জুগিয়ে চলে।

বাহাউদ্দিন গোলাপ

(লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। সভাপতি, ৭১'র চেতনা)