গুলিতে ঝাঁজরা শরীর, হাসপাতালে হামলা, কারাগারে নির্যাতন—তবু অদম্য পার্নেল
গুলিবিদ্ধ হয়েও হাসপাতালে নিরাপদ ছিলেন না, ক্ষতবিক্ষত শরীরে ঘুরেছেন এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে; ১৭ বছর পরিবারের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমানো কিংবা একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সুযোগও হয়নি—জেলা যুবদলের সভাপতি পদে আলোচনায় এই নেতা রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ, শরীরে গুলির ক্ষত, গ্রেপ্তার, ১১টি মামলা, চারবার কারাবরণ, কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে গিয়েও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর।
ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ঘুরেছেন, কখনো নিজের মতো করে ওষুধ খেয়েই কাটাতে হয়েছে অসুস্থতার সময়। গ্রেপ্তারের আতঙ্কে মাসের পর মাস আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে ঘুমানো কিংবা এক টেবিলে বসে খাবার খাওয়ার সুযোগও হয়নি দীর্ঘদিন।
আরও পড়ুন: দেশকে অস্থিতিশীল করতে আন্দোলনের নামে নাশকতার অপচেষ্টা: রিজভী
এত প্রতিকূলতা, ভয়, অনিশ্চয়তা আর ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য ত্যাগের মধ্যেও রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে সরে দাঁড়াননি কিশোরগঞ্জ জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক তারিকুজ্জামান পার্নেল।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পার্নেল বলেন, পুলিশের গুলিবর্ষণের মুখে একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো আর বেঁচে ফেরা হবে না। চারপাশে গুলির শব্দ আর শরীরে আঘাতের যন্ত্রণা তাঁকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হয়নি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। ফলে হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। কখনো ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে ইজারা দেওয়া যাবে না: জামায়াত আমির
পার্নেলের ভাষ্য, পুলিশের গুলিবর্ষণের পর তাঁকে থানায় নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। সেখানে একাধিকবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কারণে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলেন। গ্রেপ্তারের ভয়, মামলা ও হামলার আশঙ্কা সব সময় তাড়া করে বেড়াত।
তাঁর কাছে রাজনৈতিক সংগ্রামের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি ছিল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন। পার্নেল বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে ঘুমাতে পারেননি। একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার সুযোগও ছিল না। কখনো আত্মগোপনে, কখনো নিরাপত্তাহীনতায়, আবার কখনো গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। পরিবারের মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্ট নিয়েই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন।
তাঁর অনুসারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। কারাগারে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
শুধু রাজপথ কিংবা কারাগারেই নয়, নিজ বাড়িতেও একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই নেতার। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় মাসের পর মাস থাকতে হয়েছে আত্মগোপনে। স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন, নিরাপদে বসবাস এবং প্রিয়জনদের সান্নিধ্য—সবকিছুই যেন রাজনৈতিক জীবনের প্রতিকূলতার কাছে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া তারিকুজ্জামান পার্নেলের সাংগঠনিক পথচলা দীর্ঘদিনের। তিনি জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও কার্যকরী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা বিএনপির সহছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
এবার কিশোরগঞ্জ জেলা যুবদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় এসেছে তাঁর নাম। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রতিকূল সময়ে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিগত দিনের সাংগঠনিক ভূমিকা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সভাপতি পদে আলোচনার বিষয়ে তারিকুজ্জামান পার্নেল বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ বুকে ধারণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। দলের দুঃসময়ে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। রাজনীতি কখনো পদ-পদবির জন্য করিনি। জীবনের অনেক মূল্যবান সময়, পারিবারিক সুখ ও স্বাভাবিক জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে বলে প্রত্যাশা করি।” তিনি আরও বলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী দলের আদর্শ ধারণ করে মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চান।
একদিকে রাজনৈতিক মামলা, কারাবাস, গুলিবিদ্ধ হওয়া, হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ; অন্যদিকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবন। সব মিলিয়ে তারিকুজ্জামান পার্নেলের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা এখন জেলা যুবদলের নতুন নেতৃত্ব গঠনকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে। তাঁর অনুসারীরা এসব অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভূমিকার মূল্যায়ন প্রত্যাশা করছেন। তবে নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে শেষ পর্যন্ত কে দায়িত্ব পাচ্ছেন, সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন নেতাকর্মীরা।





