মা দিবসে উঠে এলো শরীয়তপুরের এক মায়ের হৃদয়ছোঁয়া জীবন-সংগ্রামের গল্প
চার সন্তানকে রেখে পাঁচ বছর আগে মারা যান তাসলিমা বেগমের স্বামী। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্বামী মারা যাওয়ার পর অনেকেই অনেক ধরনের কথা বলেছেন, কিন্তু কেউ তাঁর সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেননি। বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি ও হাঁস-মুরগি পালন করে প্রথমে ছেলে-মেয়েকে খাইয়েছেন। এরপর তারা বড় হতে থাকলে খরচ বাড়লেও তাঁর আয় বাড়েনি। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করেছেন। এরপর হাঁস-মুরগি বিক্রি করে একটি সেলাই মেশিন কিনে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন।
এভাবেই নিজের জীবন-সংগ্রামের কথা বলছিলেন সংগ্রামী মা তাসলিমা বেগম। তিনি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নশাসন ইউনিয়নের সরদারকান্দি গ্রামের মৃত দুলাল সরদারের স্ত্রী।
আরও পড়ুন: কাপাসিয়ায় পাঁচ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে টেক্সিক্যাব চালক দুলাল সরদারের সঙ্গে বিয়ে হয় ১৬ বছর বয়সী তাসলিমা বেগমের। বিয়ের পর কয়েক বছর বেশ ভালোভাবেই কাটছিল তাদের সংসার জীবন। এরপর হঠাৎ করেই স্বামী দুলাল সরদার স্ট্রোকজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বামীর চিকিৎসার জন্য নিজেদের সামান্য পুঁজিসহ ঋণ করে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় করলেও ৫ বছর আগে মারা যান দুলাল সরদার। এরপর চার সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তাসলিমার সংগ্রামী জীবন।
স্বামী মারা যাওয়ার পরে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের কটু কথা বলেছে তাসলিমাকে। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি সেসব কথায় কর্ণপাত করেননি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য তাসলিমা বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন শুরু করেন। খুব কষ্টে ছোট সন্তানদের খরচ কোনো মতে হলেও সামলাতে পারছিলেন। সন্তানরা একটু বড় হলে তিনি পড়েন বিপাকে। এরপর হাঁস-মুরগি বিক্রি করে একটি সেলাই মেশিন কিনে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। বাড়ির আঙিনার শাকসবজি ও সেলাইয়ের উপার্জন দিয়ে তাসলিমা বেগম তাঁর চার সন্তানকে বড় করেছেন। তাঁর বড় ছেলে ইয়াসিন আরাফাত বর্তমানে ঢাকার একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। বড় মেয়ে আয়শা আক্তারকে বিয়ে দিয়েছেন। মেজো মেয়ে হাবিবা খাতুন এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট মেয়ে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। বাবার অবর্তমানে তাসলিমা বেগম সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে যে কষ্ট করেছেন তা সাধারণত দেখা যায় না। বর্তমানে তাঁর বসবাস ভাঙা একটি টিনের ঘরে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত
তাসলিমা বেগমের মেজো মেয়ে হাবিবা খাতুন বলেন, “বাবা যখন মারা যান, তখন আমরা অনেক ছোট। মা আমাদের খেতে দিয়ে নিজে অনেক সময় না খেয়ে থাকতেন। বাড়ির হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি ও সেলাইয়ের উপার্জনের টাকায় আমরা পড়াশোনা করেছি। আজ আমি এইচএসসি পরীক্ষার্থী। খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করছি। বর্তমানে আমি শিশুদের টিউশনি করিয়ে মাকে সংসারে সহযোগিতা করি। আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা। আমি আমার মায়ের জন্য দোয়া চাই।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বর্তমানে ভাঙা একটি টিনের ঘরে বসবাস করছি। কিন্তু গরিব পরিবারের সন্তান হওয়ায় মায়ের একার পক্ষে আমাদের ঘর মেরামত করা সম্ভব না। বৃষ্টি হলে ঘরে ঘুমাতে অনেক কষ্ট হয়।”
তাসলিমা বেগম বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি মনে হয় নদীতে পড়ে গেছিলাম। একদিকে স্বামীর চিকিৎসার ঋণের বোঝা, অন্যদিকে সন্তানদের খাবারের খরচ। আমি বাড়িতে শাকসবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন এবং সেলাইয়ের কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছি। বড় ছেলেকে বেশি পড়াতে পারিনি, তবে সে এখন মোটামুটি ভালো আছে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। মেজো মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আজ মা দিবস, আমার সন্তানরা আরও বড় হবে—এটাই আমার প্রত্যাশা।”
প্রতিবেশী ফুলু বেগম বলেন, “ছোট ছোট সন্তান রেখে তাসলিমার স্বামী মারা যাওয়ার পর সে অনেক কষ্ট করেছে। হাঁস-মুরগি পালন ও সেলাইয়ের কাজ করে সে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছে। এমন কষ্ট করে সন্তান মানুষ করতে আমি আর দেখিনি। তার জন্য দোয়া করি।”





