পাইকগাছায় লবণাক্ত ঘেরের আইলে অসময়ের তরমুজ চাষে সাফল্য

Sadek Ali
শেখ দীন মাহমুদ,পাইকগাছা
প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:২৪ অপরাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পাইকগাছার লবণ পানির ঘেরের আইলে (বেড়িবাঁধে) অসময়ে তরমুজ চাষে সফলতা এসেছে। লবনাক্ততাসহ নানা প্রতিকূলতা জয় করে উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নে এবার অন্তত ১২৫ বিঘা জমিতে চাষ হচ্ছে অসময়ের তরমুজ। গত বারের তুলনায় যা তিন গুণেরও বেশি।

একসময় অনাবাদি (অব্যবহৃত) পড়ে থাকা ঘেরের উঁচু আইল কাজে লাগিয়ে স্থানীয় কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগীতায় তরমুজসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে মারধর, গ্রেপ্তার বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, সোলাদানা ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা বছরের দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির উপস্থিতি থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন দূরুহ। এ পরিস্থিতিতে ঘেরের উঁচু ভেড়ি ও আইল ব্যবহার করে অসময়ের তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকেরা। গত বছর ইউনিয়নটিতে প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে এ পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৫ বিঘায়।

ইতোমধ্যে ইউনিয়নের ছালুবুনিয়া, খালিয়াচক, টেংরামারী (মাস্টারপাড়া), নায়েবখালী, পূর্ব দীঘা, দক্ষিণ কাইনমুখী ও বেতবুনিয়া গ্রামের মাঠে মাঠে তরমুজগাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ঘেরের উঁচু আইলে বাঁশের মাচা তৈরি অথবা নেট দিয়ে তৈরি মাচায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তরমুজের সবুজ লতা। তরমুজের পাশাপাশি চাষ হচ্ছে পুঁইশাক, শসা, মিষ্টিকুমড়া ও করলাসহ নানা প্রজাতির সবজি। এতে একই জমি কাজে লাগিয়ে একাধিক ফসল উৎপাদন এবং বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: ঢাকায় বিমানের জরুরি অবতরণ, চিকিৎসাধীন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু

স্থানীয় কৃষকদের সাফল্য দেখে এ চাষে আগ্রহ বাড়ছে অন্যদেরও। ছালুবুনিয়া গ্রামের কৃষক চিরঞ্জীব ঢালী, হিমাদ্রি ঢালী, অভিজিৎ ও কাকুলী রায়সহ অনেকে এ চাষে যুক্ত হয়েছেন। কৃষক হিমাদ্রি ঢালী জানান, দুই বছর আগে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ শুরু করেন। ওই পরিমাণ জমিতে তাঁর খরচ হয়েছিল ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। পরে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে বিঘাপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। তাঁর এ সাফল্য এলাকার অন্য কৃষকদেরও তরমুজ চাষে উৎসাহিত করেছে।

অপরদিকে খালিয়াচক গ্রামের গোলক মণ্ডল ও দিলীপ কুমার মণ্ডলসহ অনেক কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করছেন। তরমুজের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করে কোনো কোনো কৃষক লাখ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন।

সোলাদানা ইউনিয়নের আমুরকাটা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শেখ তোফায়েল আহমেদ তুহিন বলেন, “সাধারণ মৌসুমের তুলনায় অফ-সিজনে তরমুজ চাষে উৎপাদন খরচ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম। ঘেরের ভেড়ি উঁচু করে এবং মিষ্টি পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এ চাষ করা হচ্ছে। এতে একদিকে অনাবাদি জমির ব্যবহার বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, বিসিআরএল প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে তরমুজের বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. একরামুল হোসেন বলেন, “উপকূলীয় প্রতিকূল আবহাওয়া ও লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঘেরের ভেড়িতে অফ-সিজন তরমুজ চাষ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। স্বাভাবিক মৌসুমের তুলনায় অসময়ের তরমুজের বাজারে চাহিদা ও দাম বেশি পাওয়া যায়। কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সার্বিক সহযোগিতা দিতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘেরের অনাবাদি ভেড়িতে অফ-সিজন তরমুজ ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ উপকূলীয় কৃষিতে বৈচিত্র্য আনছে। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় জমির কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।