নিখোঁজের আড়ালে ছিল জোড়া হত্যাকাণ্ড, ২ বছর পর সিআইডির রহস্য উদঘাটন

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন, ২৫ মে ২০২৬ | আপডেট: ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, ২৬ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সম্পত্তির লোভে সৎ মা ও শিশুপুত্রকে হত্যা করে লাশ গুমের চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটন করেছে সিআইডি। প্রায় দুই বছর ধরে নিখোঁজের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য ভেদ হয়েছে অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি ও দেহাবশেষ উদ্ধারের মাধ্যমে।

জানা গেছে, ২০১২ সালের দিকে বিধবা কমলা খাতুন দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদকে। এটি দু’জনেরই দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। পরে তাদের সংসারে জন্ম নেয় একমাত্র ছেলে নোমান। আবুল কালাম আজাদের প্রথম সংসারের পাঁচ ছেলের মধ্যে বর্তমানে তিনজন জীবিত রয়েছেন।

আরও পড়ুন: রাজধানীর কালশী বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে

প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যু হলে কমলা খাতুন তার ছেলে ও সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। তবে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। মৃত্যুর আগে আবুল কালাম আজাদ দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন ও ছেলে নোমানের নামে বসতভিটাসহ প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।

২০২৪ সালের ১০ মার্চ সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানায় জিডি করেন যে, ৯ মার্চ থেকে তার সৎ মা নিখোঁজ। পরে কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম বিষয়টি সন্দেহজনক মনে করে ১৪ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ পিটিশন মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাগর, রাজু, শ্যামলী ও কাজলকে সন্দেহভাজন আসামি করা হয়।

আরও পড়ুন: কালশি বস্তিতে ভয়াবহ আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ১৩ ইউনিট

আদালতের নির্দেশে প্রথমে ডিবি পুলিশ এবং পরে সিআইডি তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে সিআইডি জানতে পারে, সম্পত্তি নিজেদের নামে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অভিযুক্তরা কমলা খাতুনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। এমনকি জমি বিক্রির টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েও বিরোধ চলছিল।

তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কমলা খাতুন ও তার ছেলে নোমানকে মারধর করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

একপর্যায়ে কমলা খাতুনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে সিআইডি। তদন্তে জানা যায়, ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল। পরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, মামলার আসামি সাইফুল ইসলাম রাজন রাজু ওই বাসার ভাড়াটিয়া ছিলেন।

দীর্ঘ তদন্ত ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর এলাকা থেকে রাজুকে গ্রেফতার করে সিআইডি। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২২ মে সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে জিয়াউর রহমান সাগর ও সহযোগী আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেফতার করা হয়।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা জানান, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনার প্রায় ১৫ দিন আগেই তারা হত্যার পরিকল্পনা করে। বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগেই একটি গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়, যাতে হত্যার পর লাশ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া যায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের খাবারের পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে তারা অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা গলায় গামছা পেঁচিয়ে, গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে।

হত্যার পর আলামত নষ্ট করতে তাদের পরনের কাপড় খুলে ফেলে লাশ দুটি মাটিচাপা দেওয়া হয়। ব্যবহৃত গামছা ও কাপড় আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয় বলেও স্বীকার করেন অভিযুক্তরা।

অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৪ মে সকালে সিআইডি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে পুকুর সেচ ও খনন কার্যক্রম চালিয়ে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের দেহাবশেষ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য দেহাবশেষ নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় গ্রেফতার তিন অভিযুক্ত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

বর্তমানে মামলার তদন্ত করছে সিআইডি নোয়াখালী ইউনিট। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।