সর্বনিম্ন বেতন কাটছাঁটের চেষ্টা হলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:৫৪ অপরাহ্ন, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৬:৫৪ অপরাহ্ন, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘ ১১ বছর পর নবম জাতীয় পে স্কেল প্রণয়নের প্রক্রিয়ার মধ্যেই সর্বনিম্ন বেতন নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে। সচিব কমিটির সুপারিশ করা সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা বেতনও যদি কমিয়ে দেওয়া হয়, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। একই সঙ্গে বাজারমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন বেতন আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

শনিবার (১৫ আগস্ট) সংগঠনের সভাপতি আব্দুল মালেক ও মহাসচিব আশিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ অবস্থানের কথা জানানো হয়।

আরও পড়ুন: মাদারীপুরে মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণ, আহত ৫

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও আন্দোলন-সংগ্রামের পর নবম জাতীয় পে স্কেল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন নিয়ে কোনো ধরনের কাটছাঁট করা হলে তা হবে তাদের প্রতি চরম অবিচার। সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে বরং তা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

১০০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশেও ক্ষোভ: 

আরও পড়ুন: নান্দাইলের সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের সঙ্গে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর মতবিনিময়

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে সংগঠনটি বলেছে, সচিব কমিটি নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। বর্তমানে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এর সঙ্গে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি যোগ করলে মূল বেতন দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা করার কথা বলা হচ্ছে।

সংগঠনের নেতারা বলছেন, শুধু বেতন দ্বিগুণ করলেই বাস্তবে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বাড়বে না। গত এক দশকে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাতেই ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে বর্তমান বাজার বাস্তবতায় সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করাও অনেক নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর জন্য যথেষ্ট নয়।

তাদের অভিযোগ, বেতন কমিশনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করার সময় যদি সর্বনিম্ন বেতন আরও কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করবে।

‘আগের তুলনায় প্রস্তাব অপর্যাপ্ত’: 

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি বলেছে, অতীতের বিভিন্ন পে স্কেলে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১৪০ শতাংশ বা তারও বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ বাস্তবায়নের নজির রয়েছে। সেই তুলনায় এবার নিম্ন গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবকে তারা অপর্যাপ্ত বলে মনে করছে।

সংগঠনটির মতে, শুধু অতীতের বেতন বৃদ্ধির হার নয়, বর্তমান সময়ের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়েও নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ, আগের পে স্কেলের সময় যে আয় দিয়ে একটি পরিবার মোটামুটি স্বচ্ছন্দে চলতে পারত, বর্তমান বাস্তবতায় একই আয়ে সেই জীবনযাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

১১ বছর পরও অনিশ্চয়তা: 

বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘ ১১ বছর পর নবম জাতীয় পে স্কেল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু পে স্কেল বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতায় কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

সংগঠনটি বলেছে, ২০২০ ও ২০২৫ সালে দুটি পে স্কেল পাওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার আগেই পুরোনো বেতনের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে।

বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের অবস্থা সবচেয়ে সংকটাপন্ন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, একজন নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীর মাসিক আয় থেকে বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় মেটানোর পর সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে মাসের শেষ দিকে ধার-দেনার ওপর নির্ভর করতে হয়।

৩৫ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বেতনের দাবি: 

জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর মতবিনিময় সভায় কর্মচারীদের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি এবং আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

সেখানে দুটি পে স্কেলের সমন্বয় করে সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু ওই দাবির তুলনায় সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা বেতনের সুপারিশকে অনেক কম বলে মনে করছে সংগঠনটি।

অন্যদিকে ১:৪ অনুপাতে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব থাকলেও তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।

সংগঠনটির নেতাদের প্রশ্ন, সর্বোচ্চ বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে যদি বিদ্যমান প্রস্তাবের চেয়েও বেশি বৃদ্ধির সুযোগ থাকে, তাহলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেলায় কেন সর্বনিম্ন বেতন কমানোর আলোচনা উঠবে?

‘বেতন কমানো হলে বৈষম্য আরও বাড়বে: 

কল্যাণ সমিতির নেতারা মনে করছেন, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে বা প্রত্যাশার তুলনায় কম রেখে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান আয়-বৈষম্য আরও বাড়বে। এতে কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মপরিবেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাদের মতে, একটি জাতীয় পে স্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও জড়িত।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বার্তা: 

বিবৃতিতে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি বলেছে, সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকার সুপারিশও যদি আরও কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা সাধারণ কর্মচারীরা মেনে নেবেন না। তবে দাবি আদায়ে গণতান্ত্রিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার বার্তা দিয়েছে সংগঠনটি।

সংগঠনের নেতারা বলেন, সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার ও জীবনযাত্রার মান রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। নতুন পে স্কেল এমন হতে হবে, যাতে একজন কর্মচারী তার পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।

তারা বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য বাড়বে, কিন্তু বেতন সেই অনুপাতে বাড়বে না—এমন পে স্কেল কর্মচারীরা চান না।’ জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কর্মীদের জীবনমান নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করছে সংগঠনটি।

দ্রুত গেজেট প্রকাশের দাবি: 

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে সচিব কমিটি ও মন্ত্রিসভার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকার প্রস্তাব আরও কিছুটা বাড়িয়ে বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নবম জাতীয় পে স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো প্রণয়ন এবং দ্রুত গেজেট প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।

সংগঠনটির ভাষ্য, নতুন পে স্কেল হতে হবে কর্মচারীবান্ধব, বৈষম্যহীন ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।