ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট
উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে ভোটগ্রহণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে জমতে শুরু করে মানুষের ভিড়। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় পরিণত হয় দীর্ঘ সারিতে। নারী, পুরুষ, তরুণ, প্রবীণ— সব বয়সী ভোটারদের উপস্থিতিতে অনেক কেন্দ্রেই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সকাল থেকেই ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি চোখে পড়ে। কেউ পরিবার নিয়ে এসেছেন, কেউ আবার প্রতিবেশীদের সঙ্গে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় তাদের। অনেকেই বলেন, দীর্ঘ সময় পর ভোট দিতে পারার অনুভূতি আলাদা। এক ধরনের নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং অংশগ্রহণের আনন্দ কাজ করছে সবার মধ্যে।
আরও পড়ুন: কেন্দ্রে স্বস্তি, ভোট দিতে পেরে খুশি— বলছেন ভোটাররা
নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ৭টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। তবে তার আগেই নির্বাচন কর্মকর্তারা কেন্দ্রে পৌঁছে ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, সিল, ভোটার তালিকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত করেন। পোলিং কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা আর নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক উপস্থিতি মিলিয়ে কেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয় নিয়ন্ত্রিত কিন্তু প্রাণবন্ত পরিবেশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতিটি কেন্দ্রে টহল দিতে দেখা গেছে। কোথাও পুলিশ, কোথাও র্যাব, আবার কোথাও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটারদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তারা সক্রিয় রয়েছেন।
আরও পড়ুন: ভোটগ্রহণের শুরুটা ভালো হয়েছে: কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে তরুণ প্রজন্ম। মোট ভোটারের প্রায় ৪৫ শতাংশ ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ। এছাড়া, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।
সংসদ ভোটে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে (শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত)। এ নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী ভোটযুদ্ধে লড়ছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন।
মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। এবারের নির্বাচনে সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঝুঁকি সামলাতে নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
মোট ভোটার ১২ কোটি, এগিয়ে পুরুষরা
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চলতি বছর তিনবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে ভোটেরযোগ্য মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।
এই বিশাল ভোটারকে সামলাতে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করেছে ইসি। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন, পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। আর ভোটারদের ভোট নিতে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন দায়িত্ব পালন করবেন।
ইসি জানিয়েছে, আগামীকালের সংসদ ভোটে সেনাবাহিনী (১ লাখ ৩ হাজার), পুলিশ (১ লাখ ৮৭ হাজার), আনসার (৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন), বিজিবি (৩৭ হাজার ৪৫৩), নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, কোস্টগার্ড ও বিএনসিসি মিলিয়ে মোট ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এবার নির্বাচনে সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ ভোটের মাঠে দায়িত্ব পালন করছে।
ভোটের মাঠে ৫৪০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশে এসেছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জনসহ কমনওয়েলথ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি রয়েছেন। আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স ও এপির মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো এবং সন্তোষজনক। তবে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টিরও বেশি তদন্ত করা হয়েছে। এছাড়া ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্টচক্র সহিংসতা ঘটাতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তারই প্রমাণ।





